শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়: যাত্রা শুরু স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’-এর

৪,৫৯২ জনের জনবল; থাকবেন ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টো ও ম্যালওয়্যার বিশ্লেষকসহ বিশেষজ্ঞরা

দেশে ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে যাত্রা শুরু করেছে বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’। একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এ ইউনিটের অনুমোদিত জনবল ৪ হাজার ৫৯২ জন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর পুলিশ সদর দপ্তরের ‘হল অব ইন্টেগ্রিটি’তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ইউনিটটির উদ্বোধন করেন।

পরে পুলিশ সদর দপ্তরের ‘হল অব প্রাইড’-এ আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন ইউনিটের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যপরিধি, জনবল, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

এআই যুগের অপরাধ মোকাবিলায় নতুন কাঠামো

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলা করা কঠিন। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।

নতুন ইউনিটটির নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত আইজিপি মো. ইকবাল হোসেনকে। বিভাগীয় পর্যায়ে ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এর কার্যক্রম তদারক করবেন।

থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধসংক্রান্ত সেবা ও তদন্তের জন্য আলাদা জনবল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ওসির নেতৃত্বে সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই), সহকারী সাব-ইনস্পেক্টর (এএসআই) ও কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যরা এসব দায়িত্ব পালন করবেন।

জনবল ৪,৫৯২

অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী সাইবার পুলিশ ইউনিটের মোট জনবল হবে ৪ হাজার ৫৯২ জন। বিদ্যমান পুলিশ বাহিনীর অভিজ্ঞ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত সদস্যদের এ ইউনিটে অগ্রাধিকার দিয়ে পদায়ন করা হবে। পাশাপাশি নতুন নিয়োগের মাধ্যমেও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় জনবল পূরণ করা হবে।

ডার্ক ওয়েব থেকে ক্রিপ্টো—থাকবেন বিশেষজ্ঞ

নতুন ইউনিটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রথাগত পুলিশি কাঠামোর বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সুযোগ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী আউটসোর্সিং ও চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় সিস্টেম অ্যানালিস্ট, ফাইন্যান্সিয়াল ডেটা অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, ডার্ক ওয়েব অ্যানালিস্ট, ক্রিপ্টো অ্যানালিস্ট, ম্যালওয়্যার অ্যানালিস্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট নিয়োগ করা হবে।

এ ছাড়া ইমার্জেন্সি রেসপন্স কনসালটেন্ট ও ডিজাস্টার রিকভারি বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন কারিগরি পদে দক্ষ পেশাজীবীদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের জন্য পৃথক ও আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো রাখার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

ইউনিট পরিচালনায় যুক্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের দেশে-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। কাজের অবদানের ভিত্তিতে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থাও থাকবে।

গড়ে উঠবে আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব

সাইবার অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ইউনিটটির অধীনে অত্যাধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানি লন্ডারিং, আর্থিক অপরাধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক অপরাধ, গুজব, মাদক ও উগ্রবাদসহ বিভিন্ন অপরাধের ধরন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে প্রচলিত তদন্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি ডিজিটাল ও ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন অপরিহার্য।

এ কারণে নতুন ল্যাবটিতে আধুনিক সাইবার প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হবে।

এক ছাতার নিচে সাইবার তদন্ত

এতদিন পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত তদন্ত ও কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে সংবাদ ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি জানান, নতুন ইউনিট চালুর ফলে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত কার্যক্রম একটি কেন্দ্রীয় ও সুসংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে তদন্তে সমন্বয় বাড়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট দেশের সাইবার স্পেসের অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ শনাক্ত, তদন্ত ও দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উদ্বোধন ও সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন