শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে: চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে দেশ পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এমপি। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শালীনতা বজায় রেখে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া আইন, অর্থনীতি, মানবাধিকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতি এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন চিফ হুইপ।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিরোধিতায় প্রশ্ন

তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলোর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর বিল অন্যতম উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা শরিয়া আইনের কথা তুলে বিলটির বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শরিয়া আইন চালুর কোনো ঘোষণা ছিল না।

তিনি বলেন, “পিতা-মাতা ভালো থাকুক—এটা কে না চায়?”

চিফ হুইপের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইনের মাধ্যমে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার তাঁদের থাকবে। সম্পত্তি পাওয়ার পর সন্তান যেন মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে বা অসহায় অবস্থায় ফেলে দিতে না পারে, সে লক্ষ্যেই আইনটি করা হয়েছে।

মা-বাবার প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলামে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য করা একটি আইনের বিরোধিতা দুঃখজনক।

গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান

গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত কথা বলেন চিফ হুইপ।

তিনি বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন। প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসা ১৩৩টি আইনের মধ্যে ১৬টি সংসদীয় পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে সেগুলো আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

চিফ হুইপের দাবি, গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে ১৬ জন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনজীবী, বিচারক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন অংশীজনের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ না থাকে।

তিনি জানান, নতুন মানবাধিকার বিলে আগের ‘অনূর্ধ্ব ১০ বছর’ শাস্তির বিধানের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন শাস্তির সীমা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।

পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার ঋণ ও সুদ পরিশোধের দাবি

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বিপরীতে গত পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমপি-মন্ত্রীদের রসিদ ছাড়া বিল পরিশোধ না করা, সরকারি প্রটোকল কমানো এবং সাধারণ জীবনযাপনে উৎসাহিত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারি খাবারের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আগে বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা খাবারের বিল হতো। বর্তমান সরকার এ খাতের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে আগের সরকারের নীতির সমালোচনা

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, একটি ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই বছর সময় প্রয়োজন। ফলে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের সমাধানেও সময় প্রয়োজন।

তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকার আদানি গ্রুপের সঙ্গে অসম চুক্তির মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৭ শতাংশ বৈদেশিক নির্ভরতা তৈরি করেছিল। বিদ্যুৎ না পেলেও বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তিসংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আগের ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকেরও সমালোচনা করেন চিফ হুইপ।

দুই কোটি পরিবারের জন্য কৃষক কার্ডের উদ্যোগ

কৃষি খাতে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এ ছাড়া দুই কোটি পরিবারের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সারের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশে সারের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে ১৬ থেকে ১৭ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সার মজুদ রয়েছে।

তবে সার বিতরণে সাময়িক সমস্যার জন্য বিগত সরকারের সময়ের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ডিলারের অনুপস্থিতিকে দায়ী করেন তিনি। এসব ডিলারের কেউ কেউ কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন চিফ হুইপ।

কৃষি উৎপাদন বাড়াতে খাল খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

‘১৯৭৪ সালে রাস্তার পাশে শত শত লাশ দেখেছি’

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের স্মৃতিচারণ করে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি ফার্মগেট থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত রাস্তার পাশে শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন।

তিনি দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় এবং খাদ্য রপ্তানি শুরু করে।

বর্তমানে কৃষক কার্ডের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ইমামদের জন্য ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান চিফ হুইপ।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক এবং চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়াসহ বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি গ্রহণ করেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।

অর্থ পাচার রোধ ও দেশের আর্থিক সুরক্ষার জন্য অর্থমন্ত্রী ১৮(ক) ধারা বাতিল করেছেন বলেও জানান তিনি।

‘তারেক রহমান পুরো দেশের প্রধানমন্ত্রী’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন জনসভার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি পুরো দেশের প্রধানমন্ত্রী।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে জনগণের দুর্ভোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।

নূরুল ইসলাম মনি বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা ধরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সংসদে বিতর্ক থাকবে, থাকতে হবে শালীনতাও

সংসদে বাক্‌স্বাধীনতা চর্চার পাশাপাশি শালীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে চিফ হুইপ বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকবেই। তবে জাতীয় স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শালীনতা বজায় রেখে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র পুনর্নির্মাণে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া এবং এ. বি. এম. আশরাফ উদ্দিন নিজান উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন