শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেল আমদানিতে রেকর্ড ব্যয়, এক বছরেই দ্বিগুণের বেশি

২০২৫-২৬ অর্থবছরে খরচ ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার

আগের বছর ছিল ৫.১৪ বিলিয়ন ডলার • নয় মাসে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ • বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও বাড়তি চাহিদাকে বড় কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশে চাহিদা ও আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত অর্থবছরে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।

সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৭ শতাংশ। অর্থাৎ এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য আমদানি ছিল প্রায় ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু জ্বালানি তেল আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেশের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ গেছে জ্বালানি তেলের পেছনে।

পরিশোধিত জ্বালানিতেই ৯.৪৪ বিলিয়ন ডলার

জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের বড় অংশই গেছে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের পেছনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৯ শতাংশ।

অন্যদিকে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম বা ক্রুড অয়েল আমদানিতে গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৬২৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয়ও প্রায় ৯২ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের আমদানি করা জ্বালানির তালিকায় ডিজেল, ক্রুড অয়েল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল রয়েছে।

পরিমাণেও বেড়েছে জ্বালানি আমদানি

আমদানি ব্যয়ের বড় উল্লম্ফনের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ দাম নয়, আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধিরও ভূমিকা রয়েছে।

প্রাপ্ত নয় মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লাখ ৫ হাজার টন।

অর্থাৎ নয় মাসেই আমদানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন বা ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে মোট কত টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে, সেই পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত তেল এবং বাকি ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত জ্বালানি।

যুদ্ধের পর উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক তেলের বাজার

জ্বালানি আমদানিতে রেকর্ড ব্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাকে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। পরে তা আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তবে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিসংক্রান্ত তথ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে পেট্রোলিয়াম পণ্য, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরির বিষয়টি উঠে এসেছে।

‘চাহিদা বাড়ছে, সঙ্গে বেড়েছে আন্তর্জাতিক দাম’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দুটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন—দেশে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি।

তৌফিকুল ইসলাম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছরই জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশের অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয়ে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

দেশে ডিজেল ১১৫, অকটেন ১৪৫ টাকা

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সত্ত্বেও বর্তমানে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে।

ভোক্তা পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

গত ১ জুন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হলেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়। এতে অকটেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা হয়।

এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও সরকার এই দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। ফলে জুন থেকে টানা চার মাস একই দামে এসব জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে।

দেশে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতির আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, শুল্ক-কর ও বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন উপাদান বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেলের দাম পর্যালোচনা করা হয়।

নতুন অর্থবছরের শুরুতেও আমদানি ব্যয়ে চাপ

গত অর্থবছরের রেকর্ড ব্যয়ের পর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেও জ্বালানি আমদানিতে উচ্চ ব্যয়ের ধারা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩৭৫ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের জুলাইয়ে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাই মাসে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

জুলাইয়ে দেশের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের প্রায় ২০ দশমিক ২৭ শতাংশই ছিল জ্বালানি তেলের জন্য। বিশেষ করে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৩৪৬ বিলিয়ন ডলার।

এ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে নতুন অর্থবছরেও জ্বালানি আমদানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বড় খাত হয়ে থাকতে পারে।

অর্থনীতির অন্য খাতেও প্রভাবের শঙ্কা

জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু বিপিসির আর্থিক হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন, নির্মাণ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্য ও সেবার মূল্যেও পড়তে পারে।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা, আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং সময়োপযোগী ক্রয় পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশের জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন তারা।

বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন