লড়াই মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের, ভোট দেবেন ৩৪৯ এমপি
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার জাতীয় সংসদের সদস্যরা। এবারের নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই প্রার্থীর কেউ সরে না দাঁড়ানোয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটের প্রয়োজন হয়েছে। ফলে তিন দশকের বেশি সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে ভিন্ন মাত্রার আগ্রহ।
প্রকাশ্য ব্যালটে ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে প্রকাশ্য ব্যালটে। ভোটগ্রহণের আগে নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করবেন। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর শুরু হবে গণনা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
দুই প্রার্থীর লড়াই
ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট মনোনীত এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। দুই প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকায় আজকের ভোট অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সংসদে দলীয় শক্তির হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থান অনেকটাই এগিয়ে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা ২৪৭ এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সদস্য ৯০ জন। দুই জোটের বাইরে রয়েছেন আরও ১২ জন সংসদ সদস্য। ফলে ভোটের আগে সংখ্যার হিসাবে মির্জা ফখরুলের জয়কেই সম্ভাব্য ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘ সময় পর একাধিক প্রার্থী থাকায় জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরেও নির্বাচনটি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
ভোটের কিছু অংশ সরাসরি সম্প্রচার
আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভোট শুরুর কয়েক মিনিট আগে সম্প্রচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের ভোটদানসহ নির্বাচনের নির্ধারিত অংশ সরাসরি দেখানো হবে। পরবর্তী অংশ রেকর্ড করা হবে এবং ভোট শেষ হওয়ার আগে আবার সরাসরি সম্প্রচার শুরু হওয়ার কথা।
ভোট গণনা শেষে ফল ঘোষণার প্রক্রিয়াও সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে।
শুক্রবার নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ
আজকের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের প্রস্তুতিও চলছে। আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফলে আজ ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণা এবং পরদিন শপথের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৯১ সালে হয়েছিল সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন
বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী।
সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিভিন্ন সময়ে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। এবার দুই প্রার্থী শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকায় প্রায় ৩৫ বছর পর আবার সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
নজর এখন সংসদে
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সে কারণে সাধারণ নির্বাচনের মতো জনগণ সরাসরি এই নির্বাচনে ভোট দেন না; নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সংসদ সদস্যরা।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রকাশ্য ব্যালটে সংসদ সদস্যদের ভোট এবং একই দিনে ফল ঘোষণার আয়োজন—সব মিলিয়ে আজ জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি থাকবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে।
দুপুর ২টায় শুরু হতে যাওয়া ভোটের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে কে হচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

