সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গঠনে সরকারের অঙ্গীকার, মেধাভিত্তিক পদোন্নতির ওপর জোর প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সময়ের চাহিদা ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বাস্তবতা বিবেচনায় একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি নেতৃত্ব নির্বাচন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধা, পেশাগত দক্ষতা, সততা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং চারিত্রিক দৃঢ়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

রোববার সকালে ঢাকা সেনানিবাসে সেনাবাহিনী সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত সামরিক হুমকির পাশাপাশি এখন সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব বাস্তবতা মোকাবিলায় দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন বিবেচনায় একটি টেকসই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন কৌশল অনুসরণ করা হবে।

তিনি বলেন, সরকার একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ সমন্বিত কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে। এই নীতিমালার লক্ষ্য যুদ্ধ উসকে দেওয়া নয়; বরং সম্ভাব্য সংকট, আগ্রাসন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় আত্মনির্ভরশীল ও প্রস্তুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের প্রতিরক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাহিনীর সংখ্যাগত সম্প্রসারণের পরিবর্তে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, যৌথ সামরিক সক্ষমতা এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং গণতান্ত্রিক সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতের দূরদর্শী ও দক্ষ সামরিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতিতে শারীরিক সক্ষমতা, ফিটনেস ও ব্যক্তিগত শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। তিনি মার্কিন জেনারেল এইচ. নরম্যান শোয়ার্জকফের উক্তি—‘যত বেশি শান্তিকালে ঘাম ঝরবে, যুদ্ধে তত কম রক্ত ঝরবে’—উদ্ধৃত করে বলেন, সেনাবাহিনীতে ফিটনেস ও শৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অবদানের কথাও তিনি স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, মাইন অপসারণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন এবং দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনী ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান ও মালিতে দায়িত্ব পালনকারী শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে সকালে সেনাসদরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান। অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন এবং সেনাবাহিনী সদর দপ্তরের পরিদর্শক বইয়ে মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন