শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে ফিরলেন ২৪ জেলে-মাঝিমাল্লা

কেউ বন্দি ছিলেন ৯ মাস, কেউ দুই বছরের বেশি; আরও অর্ধশতাধিক আটকের দাবি

মিয়ানমারের রাখাইনে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হেফাজতে থাকা ২৪ জেলে ও মাঝিমাল্লাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বুধবার (১৯ আগস্ট) টেকনাফের বাংলাদেশ-মিয়ানমার ট্রানজিট জেটিঘাটসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় তাদের বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফিরে আসা ২৪ জনের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি এবং ছয়জন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

বিজিবি জানিয়েছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় জলসীমা অতিক্রমের ঘটনায় এসব জেলে ও মাঝিমাল্লা আরাকান আর্মির হাতে আটক হন। পরে তাদের মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাখা হয়। দীর্ঘ যোগাযোগ ও সমন্বয়ের পর তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

ট্রলারে এনে বিজিবির কাছে হস্তান্তর

সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মি একটি ট্রলারে করে ২৪ জনকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। সেখান থেকে বিজিবি তাদের টেকনাফ জেটিঘাটে নিয়ে আসে।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বিজিবির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আটক ব্যক্তিদের ফেরাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় চালিয়ে যাওয়া হয়।

মানবিক বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পেশাদারিত্ব ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরানো সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারে এখনও আটক থাকা অন্যদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।

‘নয় মাস মানবেতর জীবন কাটিয়েছি’

ফিরে আসা টেকনাফের সাবরাংয়ের কোয়ানছড়িপাড়ার মো. শফিকের ভাষ্য, প্রায় নয় মাস আগে ছয় মাঝিমাল্লাকে সঙ্গে নিয়ে সেন্টমার্টিনের পূর্ব দিকে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তিনি। একপর্যায়ে আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে আটক করে নিয়ে যায়।

শফিক অভিযোগ করেন, বন্দি অবস্থায় তাদের প্রতিদিন প্রায় সাত ঘণ্টা শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজ করতে না চাইলে মারধর করা হতো এবং দিনে মাত্র একবেলা খাবার দেওয়া হতো।

দীর্ঘ নয় মাস পর দেশে ফিরতে পেরে স্বস্তির কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাসহ আরও অর্ধশতাধিক জেলে সেখানে আটক রয়েছেন বলে দাবি করেন শফিক। তাদেরও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

দুই বছরের বেশি বন্দি থাকার দাবি দুই রোহিঙ্গার

ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে টেকনাফের জাদিমুড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. ওসমান ও মো. কেফায়েত উল্লাহও রয়েছেন।

তাদের দাবি, নাফ নদীতে ককশিটের নৌকায় মাছ ধরার সময় বাংলাদেশের জলসীমা থেকে তাদের ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এরপর প্রায় দুই বছর দুই মাস তাদের আটকে রাখা হয়।

ওসমান ও কেফায়েত উল্লাহ অভিযোগ করেন, বন্দি অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা কৃষিকাজে শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে মারধরও করা হতো।

তবে ফিরে আসা ব্যক্তিদের এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ফেব্রুয়ারিতে ফিরেছিলেন আরও ৭৩ জন

এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আরাকান আর্মির হাতে আটক আরও ৭৩ জেলেকে নাফ নদীর শূন্যরেখা দিয়ে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৬৬ জন বাংলাদেশি এবং সাতজন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ছিলেন।

সর্বশেষ ২৪ জনকে ফেরানোর পরও মিয়ানমারে আরাকান আর্মির হেফাজতে অর্ধশতাধিক জেলে রয়েছেন বলে ফিরে আসা কয়েকজন দাবি করেছেন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, বুধবার আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে ২৪ জনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছে।

মিয়ানমারে এখনও যারা আটক রয়েছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে আটক ব্যক্তিদের দেশে ফেরানোর ঘটনায় তাদের পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে এখনও যারা মিয়ানমারে আটকে রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন