অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

বেতন বাড়ানো ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের দাবিতে ফ্রান্সে দেশব্যাপী ধর্মঘট রাজপথে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ

বেতন ও পেনশন বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগসহ নানা দাবিতে কর্মসূচি; দেশজুড়ে আটক ৪৪৮ জন।বেতন বৃদ্ধি, পেনশন সুবিধা ও শিক্ষা খাতের সংস্কারসহ নানা দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশটির বিভিন্ন শহরে আয়োজিত কর্মসূচিতে প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষের মধ্যে এক দিনে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও বৃহস্পতিবারের কর্মসূচি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়েছে।বিক্ষোভের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের কর্মীরা ধর্মঘট পালন করেন। এতে বেশ কিছু স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও রেল যোগাযোগের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে হাসপাতালগুলোতে ধর্মঘটের প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল।শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে দেশব্যাপী ধর্মঘটশুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পরে বড় ট্রেড ইউনিয়ন এবং আট বছর আগে আত্মপ্রকাশ করা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরাও এতে যুক্ত হন।

একপর্যায়ে আন্দোলনটি দেশজুড়ে বৃহত্তর সামাজিক কর্মসূচিতে রূপ নেয়।শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাককর্মী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী বড় ইউনিয়নগুলো বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়।সরকারি হিসাবে, বিক্ষোভের কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ ছাড়া স্কুলকর্মীদের প্রায় ১৩ শতাংশ ধর্মঘটে যোগ দেন। তবে ইউনিয়নগুলোর দাবি, কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়া কর্মীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।

রেলকর্মীদের একাংশ ধর্মঘটে থাকায় ট্রেন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। অন্যদিকে ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ৫ শতাংশ ধর্মঘটে অংশ নেন। ফলে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা বড় ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়েনি।বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, আটক ৪৪৮তিন সপ্তাহ আগে বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনার পর এবারের কর্মসূচি ঘিরে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। কয়েকটি শহরে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রেন, নান্তেস, লিওঁ ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে উগ্র বামপন্থি কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। দেশজুড়ে মোট ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

লিওঁতে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। পরে তাঁদের ধাওয়া দেওয়া হয়। রেন শহরে একটি হোটেলে ভাঙচুর, পুলিশের দিকে ঢিল নিক্ষেপ এবং মিছিলে অংশ নেওয়া ইউনিয়ন কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানান, তুলুজের কাছে একটি স্কুলে আগুন দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন দেশজুড়ে ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগুন নেভাতে যায় দমকল বাহিনী।আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, তাঁদের গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করার অধিকারে পুলিশ বাধা দিচ্ছে। তবে এ অভিযোগ নাকচ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, সহিংসতার মুখেও পুলিশ সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। তাঁর ভাষ্য, বিক্ষোভ যাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ থাকে, পুলিশ সদস্যরা মূলত সেটিই নিশ্চিত করেছেন।মজুরি-পেনশন ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের দাবিআন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবিতে ভিন্নতা রয়েছে। ধর্মঘটের ডাক দেওয়া ট্রেড ইউনিয়নগুলো মূলত মজুরি ও পেনশন বাড়ানোর দাবি তুলেছে।

দেশটির সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সিজিটি অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। আরেক ইউনিয়ন সিএফডিটি ন্যূনতম মাসিক বেতন ১০০ ইউরো বা প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করছে।শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো শিক্ষা বাজেটে এক হাজার কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দ চেয়েছে। পাশাপাশি স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই লাখ আসন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে তারা।অন্যদিকে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের একাংশ সরাসরি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও তাঁর সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে।

একই সঙ্গে দেশে নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরুর দাবিও তুলেছে তারা।বড়দিন ও বসন্তের নির্বাচন পর্যন্ত আন্দোলনের ইঙ্গিতরয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে বিক্ষোভ দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম। আন্দোলনকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, বড়দিন এমনকি আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত তাঁরা কর্মসূচি চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা শুক্রবার ও শনিবারও নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে।

চলতি মাসের শেষ দিকে স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও বড় ধরনের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।সরকারের অবস্থানগত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার পর এবারের বিক্ষোভ ঘিরে সরকার ‘চরম সতর্ক’ অবস্থানে ছিল বলে বুধবার রয়টার্সকে জানান সরকারের একজন মুখপাত্র।নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সফল হলেও বিক্ষোভকারীদের দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ।

ফরাসি সাংবাদিক ও ইউটিউবার উগো দেক্রিপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাক্রোঁ বলেন, ছুটির পর হাইস্কুলগুলো খোলা থাকা প্রয়োজন। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তাঁদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।মাক্রোঁর দাবি, তরুণদের কথা সরকার শুনেছে। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অধিকার থাকলেও তিনি সবাইকে ক্লাসে ফিরে পরিস্থিতি শান্ত রাখার আহ্বান জানান।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন