অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

নেতানিয়াহুকে হটাতে আইজেনকোটের পাশে আরব জোট, ৬৭ আইনপ্রণেতার সমর্থন

ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনে বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকোটকে সুপারিশ করেছে জয়েন্ট লিস্ট; ১২০ আসনের কনেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেলেও সরকার গঠনের নিশ্চয়তা নেই

ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে আরবদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট। গত সপ্তাহের সাধারণ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আসন পাওয়া আরব দলগুলোর এই সমর্থনে আইজেনকোটের পক্ষে সুপারিশকারী আইনপ্রণেতার সংখ্যা বেড়ে ৬৭-তে দাঁড়িয়েছে। ফলে ১২০ আসনের পার্লামেন্ট কনেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ সদস্যের সমর্থনের সীমা ছাড়িয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জয়েন্ট লিস্ট জানায়, তারা প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের কাছে আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করবে। এর আগে আটটি আসন পাওয়া আরবদের নেতৃত্বাধীন দল রা’আমও একই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল।

তবে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আইজেনকোট ইতোমধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জোট নিশ্চিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট হারজোগ জানিয়েছেন, শুধু সুপারিশের সংখ্যা নয়, বাস্তবে কোন প্রার্থী সরকার গঠনে সক্ষম হবেন, সেটিও বিবেচনা করবেন তিনি। আগামী রোববার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা রয়েছে।

আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭, নেতানিয়াহুর পক্ষে ৪৬

গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসরায়েলের ১২০ আসনের কনেসেটে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর আসনসংখ্যা ৪৮। আরবদের নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম পেয়েছে যথাক্রমে ১১ ও ৮টি আসন। সব মিলিয়ে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা ১৯, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে একটি রেকর্ড।

নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্টের কাছে বিভিন্ন দলের সুপারিশ নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সব দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে হারজোগ জানান, ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। অন্যদিকে ৪৬ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো নেতানিয়াহুর নাম সুপারিশ করেছে। বাকি সাতজন কোনো প্রার্থীর নাম সুপারিশ করেননি।

আইজেনকোটের পক্ষে থাকা ৬৭ জনের মধ্যে রয়েছে তাঁর নিজের দল ইয়াশার, জয়েন্ট লিস্ট, রা’আম এবং আরও কয়েকটি বিরোধী দল। তবে এসব দলের সবাই আইজেনকোটের সরকারে যোগ দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

নেতানিয়াহুর জোটে অস্বস্তি

নির্বাচনে ৫৩টি আসন পেলেও নেতানিয়াহুর জোটের ভেতরে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কট্টর-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাধ্যতামূলক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে জোটের শরিকদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সাতটি আসনের মধ্যে চারটির অধিকারী দেগেল হাতোরাহ জানিয়েছে, তারা সরকার গঠনের জন্য কোনো প্রার্থীকেই সুপারিশ করবে না। কট্টর-অর্থোডক্স পুরুষদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিল পাসে নেতানিয়াহুর জোট ব্যর্থ হওয়ায় দলটি অসন্তুষ্ট বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।

এই অবস্থান নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। যদিও তাঁর পক্ষে ৪৬ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশ রয়েছে, জোটের ভেতরের মতপার্থক্য সরকার গঠনের আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।

আরব দলগুলোর সমর্থন, কিন্তু জোটে যোগ দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই

জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন আইজেনকোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরব দলগুলোর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দূরত্ব রয়েছে। জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর জনদাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা আইজেনকোটকে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে একই সঙ্গে দলটি বলেছে, আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বৈধতা খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আইজেনকোটের বিরোধী জোটকে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।

অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের কয়েকটি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ফলে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সমর্থন সরকার গঠনের সুপারিশে ভূমিকা রাখলেও তারা সরাসরি মন্ত্রিসভায় যোগ দেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইজেনকোটকে সরকার গঠন করতে হলে আরব দলগুলোর সঙ্গে অন্তত এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হতে পারে, যাতে তারা তাঁর সরকারকে সমর্থন দেয় অথবা পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে বিরত থাকে।

নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

লিকুদ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে ভোট গ্রহণ শুরুর আগে ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে তিন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে রা’আম দলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হলেও দলটি এ ধরনের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে।

নেতানিয়াহু ও লিকুদের পক্ষ থেকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সহযোগিতাকে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে লিকুদ বলেছে, আরব জোটের সঙ্গে ইহুদিবাদী দলগুলোর সহযোগিতা ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

তবে জালিয়াতির কোনো প্রমাণ না পাওয়ার পর বুধবার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে।

আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বক্তব্যের নিন্দা হারজোগের

নির্বাচনের ফলাফল স্বীকার করে নিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

হারজোগ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলে যে অশালীন ও বর্ণবাদী বক্তব্য শোনা গেছে, তিনি তার তীব্র নিন্দা জানান। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক উল্লেখ করে তিনি তাঁদের প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথাও জানান।

নির্বাচনে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের প্রতি সমর্থন জানালেও কোনো প্রমাণ ছাড়াই আরব ভোটারদের সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত করা বা তাঁদের রাজনৈতিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন তিনি।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন প্রেসিডেন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, সরকার গঠনের দায়িত্ব কনেসেটের কোন সদস্যকে দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে দলগুলোর সুপারিশ গ্রহণ করেছেন।

রোববার সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত

বৃহস্পতিবার সব দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট হারজোগ জানান, আগামী রোববার কোনো একজন আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। তবে তাঁর মতে, সুপারিশের সংখ্যায় আইজেনকোট এগিয়ে থাকলেও দুই রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরে ও পরস্পরের মধ্যে ভেটো বা আপত্তি থাকায় কে বাস্তবে সরকার গঠন করতে পারবেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর মনোনীত প্রার্থীকে ২৮ দিনের মধ্যে জোট সরকার গঠনের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজন হলে এ সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।

আইজেনকোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো আইনপ্রণেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। কোনো প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের পথও খুলে যেতে পারে।

পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি নুর ওদেহ জানিয়েছেন, আইজেনকোটের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন ধরে রাখা। আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন ছাড়া তাঁর পক্ষে ৬১ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সমর্থনে আইজেনকোট সরকার গঠনের সুপারিশে এগিয়ে থাকলেও নতুন সরকার গঠনের পথ এখনো নিশ্চিত নয়। আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা, বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং প্রেসিডেন্ট হারজোগের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটবে কি না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন