চাহিদা জানানোর দেড় মাস পরও কেনা হয়নি অ্যাফেরেসিস কিট; ২০ হাজার কিট কিনতে নির্দেশ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের, সরবরাহে লাগতে পারে তিন থেকে চার মাস
চলমান ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে এ পদ্ধতিতে প্লাটিলেট সংগ্রহের প্রয়োজন হলে রোগীদের বাইরে থেকে কিট কিনতে হচ্ছে অথবা বেশি খরচে বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকের সেবা নিতে হচ্ছে।
ডেঙ্গুর মৌসুম সামনে রেখে কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল গত সেপ্টেম্বরেই কিট কেনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে চাহিদা জানিয়েছিল। কিন্তু নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এসব কিট কেনা হয়নি।
হাসপাতালগুলোতে কিটের সংকট ও কেনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিছু রোগীর রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদের চিকিৎসায় সুস্থ রক্তদাতার কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্লাটিলেট প্রয়োজন হয়। অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে একজন রক্তদাতার শরীর থেকে সরাসরি প্লাটিলেট সংগ্রহ করতে বিশেষ এই কিট ব্যবহার করা হয়।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংকে প্লাটিলেটের চাহিদাও বেড়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চাহিদা তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
কিটের সংকট, বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়
গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এসব রোগীর চিকিৎসায় অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস প্রয়োজন হয়। অথচ সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে অ্যাফেরেসিস কিটের কোনো সরবরাহ নেই।
চিঠিতে বলা হয়, দেশের ২২টি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে মোট ২৮টি অ্যাফেরেসিস মেশিন রয়েছে। এসব হাসপাতালের মধ্যে ১৭টি থেকে মোট ১৭ হাজার ৮৭৪টি কিটের চাহিদা পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, সরকারি হাসপাতালে কিট সরবরাহ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে তা কিনতে হচ্ছে। অধিকাংশ রোগী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় এই বাড়তি ব্যয় বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকে অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে এক ইউনিট প্লাটিলেট সংগ্রহ করতে ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংকে একজন রক্তদাতার কাছ থেকে এ পদ্ধতিতে এক ইউনিট প্লাটিলেট সংগ্রহের খরচ ২৫ হাজার ৪০০ টাকা। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে একই সেবা নিতে খরচ হয় মাত্র ২ হাজার ৭০০ টাকা।
কিট কিনতে কিনতেই শেষ হতে পারে ডেঙ্গুর মৌসুম
গত ১ নভেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এক চিঠিতে দ্রুত ২০ হাজার প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস কিট কেনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালককে নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এসব কিটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ খাতে সিএমএসডির অনুকূলে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে, এ অর্থ এখনো ব্যয় হয়নি। রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থে এই বরাদ্দ থেকে কিটগুলো কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
টিবিএসকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমান জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী কিট কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে কিটগুলো কিনে বিতরণ করতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে।
তবে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। ফলে চলতি ডেঙ্গুর মৌসুমে অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে প্লাটিলেট প্রয়োজন এমন রোগীদের চিকিৎসার জন্য সময়মতো সরকারি হাসপাতালে কিট পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও কেন আগে কিট কেনা হয়নি, জানতে চাইলে শফিউর রহমান বলেন, সাধারণ ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় এসব কিট ব্যবহার করা হয় না। গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে এগুলোর প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও জানান, এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা থেকে প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস কিট কেনা হতো।
কখন প্লাটিলেট প্রয়োজন
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই কিংবা রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমলেই তা পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তক্ষরণের লক্ষণ এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা এ সিদ্ধান্ত নেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহনূর সারমিন টিবিএসকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় বর্তমানে প্লাটিলেট ব্যবহারের প্রবণতা কমেছে। এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনটি ইউনিটে খুব কমসংখ্যক রোগীকে প্লাটিলেট দেওয়া হয়েছে। যেসব রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয় বা অন্য জটিলতা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে প্লাটিলেট ব্যবহার করা হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬৬ জন।
এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ জনে। আর হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৫ জন।
চলতি বছরের মধ্যে অক্টোবরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেম্বরজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তাই হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রক্তের উপাদানের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ডেঙ্গু ছাড়াও অন্যান্য জটিল রোগ
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিঠিতে ডেঙ্গু ছাড়াও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় অ্যাফেরেসিস কিটের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে দুর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণ, ডিসেমিনেটেড ইন্ট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন (ডিআইসি), ক্যানসার, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, রক্তের ক্যানসার এবং কেমোথেরাপিজনিত প্লাটিলেটস্বল্পতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্লাটিলেট প্রয়োজন হতে পারে। এসব রোগীর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত প্লাটিলেট সরবরাহ নিশ্চিত করতে অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে প্লাটিলেট সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে এ ধরনের কিটের ২১টি আমদানি চালানের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব চালান এসেছে নেদারল্যান্ডস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও ভিয়েতনাম থেকে।
এদিকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের (আইএফআরসি) বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল গত সেপ্টেম্বরে ১০০টি প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস কিট কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এর আগে জানুয়ারিতেও সংস্থাটি ৫০টি কিট কেনার জন্য দরপত্র প্রকাশ করেছিল।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ব্যয়ের দুর্বলতা
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা থাকলেও বরাদ্দ করা অর্থ সময়মতো ব্যয় করতে না পারার সমস্যা দীর্ঘদিনের। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ ব্যয় করেছে।
৬ হাজার ১৪ কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ১০৭ কোটি টাকা।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দও অব্যবহৃত রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম থাকার অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ধীরগতির কারণে বরাদ্দ করা অর্থ সময়মতো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে আগেই চাহিদা নিরূপণ, সময়মতো দরপত্র আহ্বান এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো মৌসুমি রোগের ক্ষেত্রে সংক্রমণ বাড়ার পর কেনাকাটার উদ্যোগ নিলে রোগীদের ভোগান্তি ও চিকিৎসার ব্যয় দুটোই বাড়ে।

