ইয়েমেনের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতির দাবির কথাও জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল; পাল্টা বক্তব্যে ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজনিত ক্ষতির হিসাব তুলে ধরেছেন হুথি-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের কাছে ৫১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং ইয়েমেনের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিজেদের স্বীকৃতি দাবি করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে অবগত কয়েকটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযান ও অবরোধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ অর্থ চেয়েছে হুথিরা।
তবে হুথিদের ঘনিষ্ঠ সানআভিত্তিক সাংবাদিক হুসাইন আলবুখাইতি এ দাবি অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ৫১ বিলিয়ন ডলারের অঙ্ক এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি চাওয়ার বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বরং যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলার বলে দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবি নিয়ে তিন পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়েছে।
৫১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবির খবর
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের রাজধানী সানআ নিয়ন্ত্রণকারী হুথিদের মধ্যে চলমান আলোচনায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫১ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে গোষ্ঠীটি। তাদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দীর্ঘদিনের বিমান হামলা ও অবরোধের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ অর্থ প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষতিপূরণের অন্যান্য অঙ্ক নিয়েও কথা হয়েছে। তবে যেকোনো সমঝোতায় কয়েক দশ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক দায় যুক্ত হতে পারে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আর্থিক ও রাজনৈতিক জটিলতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ইয়েমেনের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে হুথিদের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি। এমন দাবি মেনে নেওয়া হলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অবস্থান এবং সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
৫১ বিলিয়ন ডলারের দাবি অস্বীকার
হুথিদের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হুসাইন আলবুখাইতি দ্য নিউ আরব-কে দেওয়া বক্তব্যে ৫১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবির খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিবেদনে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ও উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আলবুখাইতি অভিযোগ করেন, হুথিরা অর্থের পেছনে ছুটছে এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ ইয়েমেনের জনগণের পরিবর্তে গোষ্ঠীটির জন্য চাওয়া হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরির উদ্দেশ্যে সৌদি আরব থেকে এ তথ্য ফাঁস করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
তিনি বলেন, সানআভিত্তিক কর্তৃপক্ষ সরাসরি এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
যুদ্ধের ক্ষতি ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলার বলে দাবি
আলবুখাইতির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের কারণে হারিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং অবকাঠামো, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য খাতের ক্ষতি। তবে এ অঙ্কের মধ্যে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ কিংবা ব্যক্তিগত বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ব্যক্তিবিশেষের ক্ষতিপূরণ আলাদাভাবে নির্ধারণ ও পরিচালনা করা হবে। দুই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে শর্তও ভিন্ন থাকবে।
অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিতে কিছুটা নমনীয়তার সুযোগ থাকতে পারে বলে জানান আলবুখাইতি। তাঁর মতে, বার্ষিক ভিত্তিতে অথবা কয়েক বছরের কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হবে না।
অন্যদিকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনো দর-কষাকষির সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন।
বাড়িঘরের ক্ষতিপূরণে প্রয়োজন হবে নথিপত্র
ব্যক্তিগত বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারি নথিপত্রের প্রয়োজন হবে বলে জানান আলবুখাইতি। তাঁর ভাষ্য, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে পুনর্নির্মাণ কর্মসূচির মাধ্যমে এসব দাবি প্রক্রিয়াভুক্ত করা হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা নির্ধারণের বিষয়গুলো আলোচনার অংশ হিসেবেই রয়েছে।
সৌদি স্বীকৃতি চাওয়ার দাবিও প্রত্যাখ্যান
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে হুথিরা ইয়েমেনের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে সৌদি আরবের স্বীকৃতি চেয়েছে বলে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন আলবুখাইতি।
তিনি বলেন, হুথিদের প্রধান দাবি সৌদি আরবের ইয়েমেন থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে রিয়াদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। বিশেষ করে ইয়েমেনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীগুলোকে সৌদি আরবের সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলবুখাইতির ভাষ্য, হুথিরা কোনো পক্ষের কাছ থেকে স্বীকৃতির অপেক্ষায় নেই। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চায় তারা।
সৌদি আরবও প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে
হুথি-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকের পাশাপাশি সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অস্বীকার করা হয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, হুথিদের পক্ষ থেকে ৫১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবি জানানোর খবরের কোনো সত্যতা নেই।
তিনি প্রতিবেদনটিকে লেখক বা তাঁদের সূত্রের কল্পনাপ্রসূত বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক-অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা এবং শান্তি প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ তোলেন।
ক্রিমলি বলেন, ইয়েমেনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রয়েছে। ফলে হুথিদের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবির বিষয়টি সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
২০১৪ সালে সানআ দখলের পর ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযান
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানআ দখল করে হুথিরা। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন জানাতে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে। দীর্ঘদিনের সংঘাতে ইয়েমেনের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও জনজীবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ওই বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী সময়ে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বজায় থাকে। এর ফলে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ ইয়েমেনে দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি এবং একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পক্ষগুলোর প্রতিশ্রুতির কথা জানায়। ওই উদ্যোগে সরকারি খাতের কর্মীদের বেতন পরিশোধ, তেল রপ্তানি, সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করা এবং সানআ বিমানবন্দর ও হুদায়দাহ বন্দরের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা
সৌদি আরব, হুথি-ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং সংবাদমাধ্যমের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবির প্রকৃত অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। ৫১ বিলিয়ন ডলার কোনো আনুষ্ঠানিক দাবি ছিল, নাকি আলোচনার প্রাথমিক অবস্থান কিংবা একাধিক প্রস্তাবিত অঙ্কের একটি—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
একইভাবে, ইয়েমেনের যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং তা কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, সে বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
আলবুখাইতি সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং নতুন করে সংঘাত শুরু হলে সৌদি আরবকে আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। সৌদি অর্থনীতি ও তেল খাতকে লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে এগুলো তাঁর বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি; নতুন করে হামলার কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনার স্বাধীন নিশ্চয়তা নয়।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেন সংঘাতের অবসানে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক, রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্য সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

