অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

রাশিয়া থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি-এলপিজি আমদানিতে আগ্রহী বাংলাদেশ

সাখালিন-২ ও পোর্টোভায়া প্রকল্প থেকে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে আলোচনা, বাণিজ্যিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থাও চায় মস্কো

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে রাশিয়ার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ পেতে আগ্রহী বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে রাশিয়ার সাখালিন-২ প্রকল্প ও পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ইথেনসমৃদ্ধ গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে সরবরাহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তসরকার কমিশনের (আইজিসি) বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাবিষয়ক পঞ্চম সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের পক্ষে সভায় অংশ নেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ইউরোপ উইংয়ের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে রাশিয়ার ফেডারেল এজেন্সি ফর ফিশারিজের প্রধান এবং কমিশনের রুশ অংশের চেয়ারম্যান ইলিয়া শেস্তাকভের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়।

সভায় রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রম জানায়, বাংলাদেশ আগ্রহী হলে সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে পেট্রোবাংলা ও সাখালিন এনার্জির মধ্যে সরাসরি আলোচনা সহজতর করতে তারা প্রস্তুত। এ ছাড়া উস্ট-লুগা প্ল্যান্ট থেকে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা এবং পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থায় রাশিয়ার আগ্রহ

জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে চায় রাশিয়া। এ লক্ষ্যে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের জটিলতা তৈরি হওয়ায় ডিজিটাল আর্থিক উপকরণসহ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে রাশিয়া। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তি পরিশোধে সৃষ্ট জটিলতাও এ উদ্যোগের অন্যতম প্রেক্ষাপট।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির একজন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, সভায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন, জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করেছেন।

বৈঠকে উপস্থিত আরেক কর্মকর্তা জানান, দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে রুশ পক্ষ। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ উদ্যোগে গুরুত্ব দিচ্ছে মস্কো।

এর আগে বাংলাদেশে রুশ ব্যাংকের শাখা খোলা, ভারতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তি এবং দুই দেশের মধ্যে স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। এবারের সভাতেও এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে।

ইআরডির নথি অনুযায়ী, রুশ এক্সপোর্ট সেন্টার গ্রুপের আওতাধীন এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। দুই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি-রপ্তানি লেনদেন নিষ্পত্তির পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ জানিয়েছে রুশ পক্ষ।

রূপপুর প্রকল্পের ঋণ পরিশোধেও জটিলতা

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধেও। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের জন্য রাখা অর্থ নিষেধাজ্ঞার কারণে সংশ্লিষ্ট রুশ ব্যাংকে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।

ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি রূপপুর প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের পথ তৈরি করাও বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

তবে এ উদ্যোগে আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে। রাশিয়া যে এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া এবং এর মূল প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টারের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে, প্রতিষ্ঠান দুটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি পরিশোধের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।

জ্বালানি ও কৃষিতে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা

জ্বালানি খাতে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এ প্রকল্পে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে রাশিয়া।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সাল থেকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জন্য দুই দেশের মধ্যে স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি সই হয়।

এ ছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে। ভোলায় প্রতিষ্ঠানটি একাধিক কূপ খনন করেছে। ২০২৩ সালে ভোলায় আরও পাঁচটি কূপ অনুসন্ধানের জন্য চিহ্নিত করে গ্যাজপ্রম ইন্টারন্যাশনাল।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশ। বিশেষ করে গম ও পটাশ সার আমদানিতে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।

এবারের সভার কার্যপত্রে সার সরবরাহ বাড়ানো এবং কৃষি গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের আগ্রহের কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি শিল্প ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়নে আর্থিক ও অ-আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করতে চায় রাশিয়া।

সভাটির কার্যপত্রে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন করপোরেশন ভিইবি.আরএফ (VEB.RF) এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়বিষয়ক সমঝোতা স্মারক সইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পোদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ প্রকল্পের তথ্য বিনিময়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রুশ ও বাংলাদেশি অংশীদারদের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে চায় উভয় পক্ষ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্য সম্প্রসারণে শুল্কসংক্রান্ত সহযোগিতাও বাড়াতে চায় দুই দেশ। এ লক্ষ্যে শুল্কবিষয়ক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ।

শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বরাদ্দ, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়গুলো রয়েছে।

জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্যিক লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা—সব মিলিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি ও বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাজনিত আইনি ও আর্থিক জটিলতা মোকাবিলা করতে হবে দুই দেশকে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন