অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

উয়েনো ব্যাংকের পতনে প্যারাগুয়েতে রাজনৈতিক সংকট, পদত্যাগের ঘোষণা পেনার

উয়েনো ব্যাংকের পতনে প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহকের অর্থ আটকে গেছে; প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তিনটি ফৌজদারি তদন্ত, সিনেটে বিচার চলছে

ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক সংকট ও পতনের ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের মুখে পড়েছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ তাঁর পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ফলে সিনেটে অভিশংসন বিচার এগিয়ে চলছে।

মঙ্গলবার আর্থিক সক্ষমতার সংকটের কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক উয়েনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং এর কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করে। এতে প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহকের অর্থ আটকে যায়। ব্যাংকটির সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন এবং পেনার অতীত ব্যবসায়িক সম্পর্ক ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও আর্থিক কেলেঙ্কারির সৃষ্টি হয়।

ব্যাংকটির সংকটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে পেনা এবং সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্তে তিনটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল এমিলিয়ানো রোলন ফের্নান্দেস। তদন্তে ব্যাংকটির তদারকি, কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া এবং সেখানে সরকারি অর্থ জমা রাখার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পদত্যাগের ঘোষণা, অভিশংসন প্রক্রিয়া চলমান

বৃহস্পতিবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন পেনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। ব্যাংকটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।

পেনার পদত্যাগের ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেশটির প্রতিনিধি পরিষদ তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে সর্বসম্মতভাবে ভোট দেয়। ৮০ সদস্যের নিম্নকক্ষে ৭৮ জনের ভোটে অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদিত হয়। এর পর বিষয়টি সিনেটে পাঠানো হয়।

পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। সিনেট অভিশংসন বিচার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুক্রবার পেনাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য হাজির হতে বলা হয়েছে।

আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, উয়েনো ব্যাংকের সঙ্গে পেনার ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকটির কার্যক্রম ও সরকারি অর্থের লেনদেনের ক্ষেত্রে তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আড়াল করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

পেনা জানিয়েছেন, তিনি বিচারে হাজির হয়ে নিজের পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ তুলে ধরবেন। তাঁর ভাষ্য, সংবিধান ও প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন।

পদত্যাগ গ্রহণ না করার পেছনে দায়মুক্তির প্রশ্ন

পেনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হলে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী তিনি আজীবন সিনেটর হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এ পদে বিশেষ আইনি সুরক্ষাও রয়েছে। বিরোধী আইনপ্রণেতাদের আশঙ্কা, পদত্যাগ গ্রহণ করা হলে ফৌজদারি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে অভিশংসনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে তিনি ওই সুবিধা পাবেন না। এ কারণে বিরোধী আইনপ্রণেতারা পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে অভিশংসন বিচার চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সিনেটর ইয়োলান্দা পারেদেস সাংবাদিকদের বলেন, পেনাকে কারাগারে পাঠানো এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা উচিত। তিনি তাঁর বিচার-পূর্ব আটকও দাবি করেন।

পেনার দল ডানপন্থি কলোরাডো পার্টির কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর দলটির একাংশ তাঁর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দলটির প্রভাবশালী নেতা হোরাসিও কার্তেসও পেনার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, পেনা বিচারে হাজির হবেন। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন—এমন গুঞ্জনও নাকচ করেছে কার্যালয়টি। এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তিনি রাজধানীতেই রয়েছেন। তবে তাঁর সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।

উয়েনো ব্যাংকের পতনে আটকে গেছে লাখো গ্রাহকের অর্থ

প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬১ লাখ মানুষের দেশটিতে উয়েনো ব্যাংকের গ্রাহক ছিলেন প্রায় ২৯ লাখ। অর্থাৎ দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশের বেশি ব্যাংকটির সেবা ব্যবহার করতেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার অনুপাত প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সীমার অর্ধেকের নিচে নেমে গিয়েছিল। ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী সংশোধনের পর এ পরিস্থিতি সামনে আসে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, অপর্যাপ্ত নথিপত্র এবং কিছু ব্যয়কে সম্পদ হিসেবে দেখানোর বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা ব্যাংকটির মালিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। এসব ঋণের কিছু ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত সীমা অতিক্রম এবং পর্যাপ্ত জামানত না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর এর অ্যাপ, কার্ড ও অর্থ স্থানান্তর সেবা বন্ধ হয়ে যায়। শাখাগুলোও বন্ধ থাকায় গ্রাহকেরা নিজেদের সঞ্চয় তুলতে পারছেন না। পেনশনভোগী ও কর্মীদের বেতন পরিশোধেও সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সাত হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাব।

তবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে আমানত গ্যারান্টি তহবিল থেকে অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গ্যারান্টি তহবিলের আওতায় প্রায় ৯৭ শতাংশ গ্রাহকের পুরো আমানত ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে ছোট অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ শুরু করার কথা জানানো হয়।

পেনার সঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবসায়িক সম্পর্ক

উয়েনো ব্যাংকের মূল প্রতিষ্ঠান গ্রুপো ভাসকেজের সঙ্গে পেনার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তিনি ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির একটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারধারী ছিলেন। পেনার দাবি, তিনি পরে তাঁর শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন এবং ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।

তবে তাঁর শাসনামলে সামাজিক নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটসহ (আইপিএস) বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উয়েনো ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা হয়। আইপিএস দেশটির অধিকাংশ কর্মীর পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা তহবিল পরিচালনা করে। গত মাসের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার আমানত ছিল। এর মধ্যে আইপিএসের অর্থও রয়েছে।

এ ছাড়া পেনা ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে কার্লোস কারভাল্লোকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কারভাল্লো এর আগে উয়েনোর পূর্বসূরি আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ছিলেন। ব্যাংকটির তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সাবেক উয়েনো কর্মকর্তার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এমিলিয়ানো রোলন ফের্নান্দেস ব্যাংকটির তদারকি, সরকারি অর্থ জমা রাখা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তে তিনটি ফৌজদারি তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। এর বাইরে ব্যাংকটির ২৭ জন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িক সহযোগীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার চেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। ব্যাংকটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

কম বয়সে প্রেসিডেন্ট, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র

১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া সান্তিয়াগো পেনা ২০২৩ সালের আগস্টে পাঁচ বছরের মেয়াদে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজের অভিজ্ঞতা থাকা অর্থনীতিবিদ পেনা এর আগে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশটির অর্থমন্ত্রী ছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেসের সরকারের সময় তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত পেনা। বিশেষ করে অভিবাসন ও নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

পেনার পদত্যাগের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখনো দৃঢ় রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের জনগণের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রতি ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশাও জানান তিনি।

ব্যাংকটির পতন ঘিরে আর্থিক অনিশ্চয়তা, সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন এখন প্যারাগুয়ের রাজনীতির কেন্দ্রে। পেনার পদত্যাগের ঘোষণা সত্ত্বেও অভিশংসন বিচার ও ফৌজদারি তদন্ত চলতে থাকায় তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ব্যাংকটির ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের বিষয়টি অনিশ্চিত রয়ে গেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন