কারচুপির অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পায়নি নির্বাচন কমিশন; নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল আইনগতভাবে বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। একই সঙ্গে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা বিতর্কিত করার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রচেষ্টা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেন হারজগ। কোন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করতেই এ পরামর্শ প্রক্রিয়া। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়।’
কারচুপির প্রমাণ পায়নি নির্বাচন কমিশন
বুধবার ইসরাইলের নির্বাচন কমিশন জানায়, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়েছে কিংবা ফলাফলে প্রভাব পড়েছে—এমন কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে পৃথক তদন্ত চালাচ্ছে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত। সংস্থাটির প্রধান ডেভিড জিনি নেতানিয়াহুর নিয়োগ করা কর্মকর্তা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
বুধবার নির্বাচন কমিটির সদস্যদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ শিন বেতের একটি গোয়েন্দা মূল্যায়ন তুলে ধরেন। এতে দাবি করা হয়, ইসরাইলের ভেতরে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রবেশের একটি ‘ব্যাপক ঘটনা’ ঘটেছে। এসব দেশের মধ্যে ইসরাইলের শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি শিন বেত। বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তির কাছ থেকে মূল্যায়নের প্রতিলিপি পেয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। রুদ্ধদ্বার বৈঠকের বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রতিলিপিটি সরবরাহ করেন।
এর আগে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, বিদেশি শক্তির নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ গুরুতর এবং তা তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এমন হস্তক্ষেপ হয়ে থাকলেও তা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করে না কমিশন।
বুধবার একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন সোলবার্গ। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল হারজগের কাছে হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এই পর্যায়ে এগুলো কেবল সন্দেহমাত্র। আর এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সম্ভাব্য প্রভাবের পরিধি সীমিত।’
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ছড়ানো বিপজ্জনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফলাফল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ‘ধ্বংস করা সহজ, কিন্তু পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন’।
জোট সরকার গঠনে শুরু আলোচনা
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকোটের মিত্ররা—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে সমঝোতার পাশাপাশি আইজেনকোটের সঙ্গে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জোট গঠনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বুধবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেন হারজগ। প্রথম দিনে নেতানিয়াহুর ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি দল তাঁকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সাবেক মিত্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা এক নেতার নেতৃত্বাধীন চতুর্থ দল আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দলসহ আরও আটটি দলের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে হারজগের। আলোচনার শেষ দিকে বৈঠক করবে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ও নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি।
আলোচনা শেষে হারজগ এমন একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যার জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোটের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়া হতে পারে।
সিদ্ধান্ত ঘোষণার জন্য কয়েক দিন সময় পাবেন প্রেসিডেন্ট। এরপর সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ ধরে জোট আলোচনা চলবে। তবে দুই নেতার কেউই সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আগামী বছরের শুরুতে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
আরব আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন নাকচ
বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে চলমান পৃথক তদন্তের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়েছিল শিন বেত। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রা’আম পার্টির নেতা মনসুর আব্বাসসহ আরব সম্প্রদায়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা রয়েছেন।
তবে শিন বেতের আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা। তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের যৌক্তিকতা প্রমাণের মতো কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া নাগরিক বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা গ্রহণযোগ্য নয়।’
আরব দলগুলোর যৌথ তালিকা ‘জয়েন্ট লিস্ট’ এ উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আরব ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করতে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা পরিকল্পিতভাবে উসকানিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি মিত্র ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির শিন বেতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সব নেতাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। সন্দেহের বিষয়গুলো পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের ‘ভূগর্ভস্থ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে’ আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদেরও দাবি জানান তিনি। তবে শিন বেতের ওপর তাঁর কোনো কর্তৃত্ব নেই।
বুধবার হারজগ বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে শিন বেতের তদন্ত চলতে পারে। তবে ইসরাইলি আরব ভোটারদের যেন কোনোভাবেই অপবাদ দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে শোনা যাওয়া ‘অশালীন ও বর্ণবাদী বক্তব্যের’ নিন্দা জানিয়ে হারজগ বলেন, আরব ভোটারদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়।

