প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উপস্থিতিতে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর; জ্বালানি, স্বাস্থ্য, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হবে ঋণের অর্থ।
সিরিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব। পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি, আবাসন, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে সহজ শর্তে ৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে রিয়াদ। বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উপস্থিতিতে এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
গত এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আল-শারার দ্বিতীয় রিয়াদ সফরের দ্বিতীয় দিনে চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তিকে এ উদ্যোগগুলোর মধ্যে ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। তবে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রস্তাবিত একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সিরিয়া যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে সরকারের বিবেচনার কথা জানিয়েছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি। এর কয়েক দিন পরই সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো।
গত শনিবার বাহরাইনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলন ‘মানামা ডায়ালগে’ আল-শাইবানি বলেন, ‘মক্কা জোটে’ সিরিয়ার যোগদানের বিষয়টি মূল্যায়নে আলোচনা চলছে।
এদিকে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক সহায়তা পেতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে সহযোগিতা চেয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে হুথিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, রিয়াদের বৈঠকে আল-শারা ও মোহাম্মদ বিন সালমান চলমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও দুই নেতা কথা বলেছেন।
তারা উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে—এমন সব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধের তাগিদ দেন।
সিরীয় রাজনৈতিক গবেষক আহমেদ কাসেম আল বলেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে আল-শারার দ্বিতীয় সফরটি অঞ্চলটির পাশাপাশি সিরিয়ার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মাত্রাও তুলে ধরছে। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশটির ভূখণ্ডে ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলি আগ্রাসন প্রতিরোধে একটি ‘প্রতিরোধক শক্তি’ গড়ে তুলতে সিরিয়ার ‘মক্কা জোটে’ যোগ দেওয়া উচিত।
পুনর্গঠনে পাঁচ খাতে ঋণ দিচ্ছে সৌদি ফান্ড
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট সিরিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ছয়টি চুক্তির আওতায় সহজ শর্তে ৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে।
এই অর্থের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পুনর্নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে ১০ কোটি ডলার, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতে ৬ কোটি ডলার এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আলেপ্পোর থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট পুনর্বাসনে ৯ কোটি ডলার এবং দামেস্ক ও ইদলিবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা উন্নয়নে ৩ কোটি ডলার দেওয়া হবে।
শিল্প, কৃষি ও পরিবেশ খাতেও চুক্তি
এসপিএর তথ্যমতে, দুই দেশের সরকার শিল্প খাতে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে আরও দুটি চুক্তি হয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকে সৌদি আরব সিরিয়ার নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
এর আগে গত ৬ অক্টোবর রিয়াদে দুই নেতা বৈঠক করেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও জরুরি সেবা পুনর্নির্মাণসহ দেশটির সামগ্রিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

