প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে দলমত, শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলভেদে বিভাজন না রেখে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবগঠিত ‘শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাস’-এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ, বাজেট বরাদ্দ, জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও ককাসের পৃষ্ঠপোষক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
ককাসের সভাপতি শিরীন সুলতানা এমপির সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার। এতে ককাসের সদস্য সংসদ সদস্য মোরশেদ মিলটন, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, আন্না মিন্জ ও মাধবী মার্মা অংশ নেন।
শিশু অধিকার সুরক্ষায় আইন প্রয়োগ জরুরি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কায়সার কামাল বলেন, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদীয় ককাসের এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শিশু অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে শিশু অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়ে অনেক আইন রয়েছে। তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আইন, বাজেট এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
শিশু অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের প্রচার-প্রচারণা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
দলমত ও অঞ্চলভেদে বিভাজন নয়
ডেপুটি স্পিকার বলেন, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দলমত, শ্রেণি-পেশা কিংবা সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সংসদ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রস্তাবিত আইন পর্যালোচনা ও সংশোধনের আহ্বান
ককাসের কার্যক্রম গতিশীল করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান কায়সার কামাল। শিশু অধিকার-সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবিত ও খসড়া আইন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রয়োজনে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা যেতে পারে বলে জানান ডেপুটি স্পিকার। নির্বাহী বিভাগে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে সংসদ সদস্যরা বেসরকারি বিলের মাধ্যমেও বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সংসদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
নির্বাহী বিভাগকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ককাসের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের সংসদীয় ককাসকে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিত টিম হিসেবে কাজ করতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ককাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বানও জানান তিনি।
প্রান্তিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অগ্রাধিকার
বৈঠকে শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষেত্র হিসেবে কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশু, পাহাড়ি অঞ্চলের শিশু এবং অসহায়, এতিম ও দুস্থ শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
এ ছাড়া শিশু সুরক্ষায় আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে শিশুদের যথাযথ শিক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান সভাপতির
ককাসের সভাপতি শিরীন সুলতানা বলেন, বর্তমান সরকার জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব কার্যক্রমের সুফল যেন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
শিশুদের সার্বিক সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অংশ নেন উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা
বৈঠকে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ও প্রতিনিধিরা, ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এ ছাড়া মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে ককাসের সভাপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ছাত্র-জনতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান।

