বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ইউনূসকে নিউইয়র্কে হেনস্তা ‘স্পষ্ট সহিংসতা’, আইনি পদক্ষেপ নেবে সরকার

আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের অভিযোগ; গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিমানবন্দরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনাকে ‘স্পষ্ট সহিংসতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় সরকার আইনি পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশকারী ব্যক্তিদের বিদেশের মাটিতে হয়রানির পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ড. ইউনূসের সরকার নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু সমালোচনার নামে কাউকে হেনস্তা করার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়াই ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে হেনস্তার চেষ্টার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের আচরণের চেষ্টা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘এগুলো আওয়ামী সন্ত্রাস’

বিদেশের মাটিতে মুহাম্মদ ইউনূসসহ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হয়রানির ঘটনাকে স্পষ্ট সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করেন তথ্য উপদেষ্টা। এসব ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থান করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠতে পারছেন না, তবে এ ধরনের প্রবণতা রয়েছে।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করায় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনও হয়রানির মুখে পড়েছিলেন। এসব ঘটনাকে কোনো ‘প্রেসার গ্রুপের’ তৎপরতা হিসেবে না দেখে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে চায় সরকার।

জাহেদ উর রহমান বলেন, অভিনেত্রী বাঁধনের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনাতেও সরকার আইনি পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তিনি।

বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তারা এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলে তা বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেওয়া হবে না।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন না

গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমা না চেয়ে আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিদেশে মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা এবং দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ করেন জাহেদ উর রহমান। এ পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে কোনো ধরনের ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা সমঝোতার সুযোগ দেখছেন না তিনি।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হতে হবে। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে কার্যক্রম চালাতে পারবে কি না, কিংবা দলটি টিকে থাকবে কি না—এসব বিষয়ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া বা অনুতাপ প্রকাশের পরিবর্তে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশে সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য, এ অবস্থায় সমঝোতার সম্ভাবনা তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেখছেন না।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সরকারের অবস্থান

আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে সরকার চাপে রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন—এটাই সরকার চায়। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়া চলছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, এটি প্রতিশোধের বিষয় নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তরের আহ্বানও জানানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে সরকারের কোনো সমস্যা নেই। বরং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার সম্পন্ন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

গণমাধ্যমের সংবাদ উপস্থাপন নিয়েও প্রশ্ন

বিদেশে মুহাম্মদ ইউনূস কিংবা জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হেনস্তার শিকার হলে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমের সংবাদ উপস্থাপনে ঘটনাগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়, যেন ভুক্তভোগীরা নিজেরাই এর জন্য দায়ী—এমন অভিযোগ তুলে এক সাংবাদিক তথ্য উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো আচরণ ফৌজদারি অপরাধ কি না এবং গণমাধ্যম কীভাবে ঘটনাগুলো উপস্থাপন করছে, তা তথ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে রয়েছে। তবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা এবং সে অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা আলাদা প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা যেতে পারে উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সেই সমালোচনা কোন পদ্ধতিতে এবং কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা আইনি সীমার মধ্যে থাকা জরুরি।

পুলিশের মনোবল ফিরছে, তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি

পুলিশ বাহিনীর মনোবল নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও পুলিশের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে সংকট ছিল। নির্বাচনের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি সংকটমুক্ত—এমন দাবি করেননি তিনি। তার মতে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের আইনগত নির্দেশনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পুলিশের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়বে। এ জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন হতে পারে।

পুলিশের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের সংকট পুরোপুরি কাটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে সচেতন রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন