সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্র পশু হাসপাতালের মোড় এলাকায় কলেজছাত্র জাকারিয়া খাঁন (১৯) হত্যা মামলার প্রধান আসামি নাহিদ হাসান (২৫) ও তার সহযোগী অমিত হাসানকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থানকালে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তার নাহিদ হাসান সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা এলাকার মৃত গিয়াসউদ্দিনের ছেলে। অপর গ্রেপ্তার অমিত হাসান একই এলাকার হুমায়ুন কবীরের ছেলে। এর আগে এ মামলার ২ নম্বর আসামি মোহিত হাসান বনি (২০)কে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দিবাগত রাতে শহরের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনে কদমগাছতলা এলাকার একটি চায়ের দোকানে নাহিদসহ কয়েকজন যুবক যায়। দ্রুত চা পরিবেশনকে কেন্দ্র করে দোকান মালিক রবিউল ইসলামের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় রবিউলের প্রতিবেশী ভাইপো বাপ্পী হাসান এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর এবং ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই সময় ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বাপ্পীকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন কাটিয়া এলাকার রুচিরা বেকারির স্বত্বাধিকারী আব্দুল গফুর খাঁনের ছেলে কলেজছাত্র জাকারিয়া খাঁন। তখন তাকে কয়েকজন মিলে মারধর শুরু করে বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে নাহিদ হাসান ধারালো অস্ত্র দিয়ে জাকারিয়ার বুকে আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় জাকারিয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই মো. শাহারিয়ার খাঁন বাদী হয়ে গত শনিবার রাতে সাতক্ষীরা সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় নাহিদ হাসানকে প্রধান আসামি করে ১২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৬ থেকে ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মো. আরিজুল ইসলাম, ছোট ময়না, মো. জুয়েল, মো. সাগর, মো. জাকির হোসেন রনি, মো. সামি, মো. নাঈম, রাশিদুর জামান রাশেদ, মো. হুজাইফা, মো. শরিফুল ইসলাম শরিফ ও মোহিত হাসান বনি।
নিহতের পরিবারের সদস্যদের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করার পরই মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রধান আসামি নাহিদকে গ্রেপ্তারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পুরস্কার ঘোষণার কথা জানান তারা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নাহিদ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে—এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সদর থানা, কালিগঞ্জ থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। মঙ্গলবার ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শুইলপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে নাহিদ ও অমিতকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম এবং গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রেপ্তার নাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অপরাধে মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যাচেষ্টা, ছিনতাই ও সহিংসতার অভিযোগে মামলার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল শহরের ‘ফুচকা বাংলা’র পরিচালক আজিজুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার মামলায়ও নাহিদকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
তবে জাকারিয়া হত্যাকাণ্ডে নাহিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তার চাচা নাসির উদ্দীন। তার দাবি, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে তাদের পরিবারকে মামলায় জড়ানো হচ্ছে। ঘটনার সময় নাহিদসহ পরিবারের কোনো সদস্য ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি। তবে নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তাদের আপত্তি নেই বলে জানান নাসির উদ্দীন।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিথুন সরকার বলেন, কলেজছাত্র জাকারিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তদন্তে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জাকারিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

