অনুসরণ করুন:
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

জাহাজশিল্পের জটিলতা কাটাতে প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ, দ্রুত টিএসডিএফ স্থাপনের নির্দেশ আব্দুল আওয়াল মিন্টুর


দেশের জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের জন্য অত্যাবশ্যক ‘ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি’ (টিএসডিএফ) দ্রুত স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনা এবং সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত কমিটির সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু। এতে বাণিজ্য ও শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর তাগিদ

সভায় জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইয়ার্ড আধুনিকায়ন, পরিবেশগত মান পরিপালন এবং বিভিন্ন অনুমোদন ও ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ গুরুত্ব পায় চট্টগ্রাম থেকেই প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট ফাইল অনুমোদনের ব্যবস্থা করার বিষয়টি।

বর্তমানে কিছু ছাড়পত্র পেতে ৪৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত সময় লাগার বিষয়টি সভায় উঠে আসে। এ বিলম্ব কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জাহাজের ক্রয়াদেশ পেতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। জাহাজ নির্মাণে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর নীতিমালা ও মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে দেশের প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজ ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি জানান, নিয়মকানুন ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে তাঁর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (বিডা) এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

‘আইন হতে হবে কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য’

কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, শুধু আইন বা বিধিমালা তৈরি করলেই হবে না; সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ও পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়—এমন নিয়ম সময়ের সঙ্গে কার্যকারিতা হারায়।

এ কারণে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনে শিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অর্থায়ন ও পুরোনো ঋণসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টিও সভায় উঠে আসে। ব্যাংকগুলোর সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে পুরোনো সমস্যায় দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে বর্তমান সংকট কাটিয়ে খাতটিকে এগিয়ে নেওয়ার কার্যকর পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

উদ্যোক্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে দ্রুত বৈঠক ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

দ্রুত টিএসডিএফ স্থাপনের নির্দেশ মিন্টুর

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধন, সংরক্ষণ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির অবকাঠামো না থাকায় ইউরোপীয় জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক পক্ষ বাংলাদেশে কাজ করতে দ্বিধা করছে। ফলে তারা বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছে এবং বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় এ বাজারের পুরো সুবিধা নিতে পারছে না।

তিনি বলেন, ইউরোপীয় জাহাজে উন্নতমানের বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান থাকে। এসব জাহাজ বাংলাদেশে আকৃষ্ট করতে হলে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এ পরিস্থিতিতে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে টিএসডিএফ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন আব্দুল আওয়াল মিন্টু।

দেশের আবাসন ও রি-রোলিং শিল্পে স্ক্র্যাপসহ বিভিন্ন কাঁচামালের ব্যাপক চাহিদার কথাও তুলে ধরেন পরিবেশমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন পরিপালনের পাশাপাশি দেশের শিল্পের কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়েও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।

ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও ‘গ্রিন ইয়ার্ড’

সভায় কার্যপত্র উপস্থাপন করেন শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান। তিনি জানান, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম গতিশীল করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্ল্যাটফর্মের ওয়ার্কিং গ্রুপ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

হংকং কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ নির্মাণের নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়েও কাজ চলছে।

ছাড়পত্র পেতে ৪৫ থেকে ৬০ দিনের বিলম্ব কমাতে চট্টগ্রাম থেকেই সংশ্লিষ্ট ফাইল অনুমোদনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে অনুমোদন সম্পন্ন করা গেলে শিল্প উদ্যোক্তাদের সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা—দুটিই কমবে বলে সভায় মত দেওয়া হয়।

হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নে গুরুত্ব

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ খাতকে পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি বা অস্পষ্টতা থাকলে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মধ্যে ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশগত মান অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা হবে না।

সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং আইন ও সংসদ বিষয়ক সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন