অনুসরণ করুন:
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ডিসেম্বরের মধ্যে কাগজবিহীন ‘স্মার্ট’ বন্দরে রূপান্তর হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর

দেশের সমুদ্রপথে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের সব কার্যক্রম আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি কাগজবিহীন ও ‘স্মার্ট’ বন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম আধুনিকায়ন, পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বন্দরের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই এ ব্যাপক ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রম হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অগ্রগতি পর্যালোচনা সভার পর এ উদ্যোগ জোরদার করা হয়। সভায় বন্দরের বিদ্যমান ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ানো, বিভিন্ন বিভাগের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় তৈরি এবং অবশিষ্ট ম্যানুয়াল কার্যক্রম ধাপে ধাপে বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, জাহাজ বন্দরে প্রবেশ থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ, কাস্টমস ছাড়পত্র, পণ্য খালাস এবং চূড়ান্ত সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ও অনুসরণযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনা হবে।

রেকর্ড পণ্য ও জাহাজ হ্যান্ডলিং

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় পুরো সমুদ্রভিত্তিক কার্যক্রমের একটি বড় অংশ পরিচালনা করে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বন্দরটি রেকর্ড ৩৪ লাখ টিইইউ (২০ ফুট দীর্ঘ) কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টন সাধারণ পণ্য এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে।

দেশের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সাধারণ পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারভিত্তিক বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভরতা ও দক্ষতা বাড়ানোকে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিচ্ছিন্ন অনলাইন সেবার পরিবর্তে সমন্বিত ব্যবস্থা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং লাইন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট অপারেটর, কাস্টমস ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষের জটিল ও বহুমাত্রিক কার্যক্রম বিবেচনায় প্রকৃত দক্ষতা নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন অনলাইন সেবার পরিবর্তে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল অটোমেশনের পরিধি বাড়ানো হবে। এরই মধ্যে জাহাজের বিলের ১০০ শতাংশ অনলাইনে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে।

বন্দরের সদ্য প্রতিষ্ঠিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক পিএলসির সঙ্গে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস বা এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কনটেইনার ও কনসাইনি বিলিং কার্যক্রম ধাপে ধাপে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম বা টিওএসের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত করা হচ্ছে।

ছুটির দিনেও অনলাইনে অর্থ পরিশোধ

বন্দর সূত্র জানায়, নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত অভ্যন্তরীণ সেবাদানকারী এজেন্টরা সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনসহ সার্বক্ষণিক অর্থ পরিশোধের সুবিধা পাবেন।

এ ছাড়া নির্ধারিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ না করা বন্দরের পাওনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায়ের জন্য ‘অটো-পুল পেমেন্ট সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সময় কমার পাশাপাশি পাওনা আদায়ে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়বে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

কাগজ ছাড়াই ডেলিভারি অর্ডারের অগ্রগতি অনুসরণ

গত জুলাইয়ে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সমন্বয়ের মাধ্যমে আমদানি কনটেইনারের ডেলিভারি অর্ডার ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বন্দর সূত্র জানায়, এর ফলে আমদানিকারকরা কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই অনলাইনে প্রয়োজনীয় নথির অগ্রগতি অনুসরণ করতে পারছেন। বন্দরের বিভিন্ন ধাপে কাগজের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াও সহজ হচ্ছে।

যানজট কমাতে টাইম স্লট ও ই-গেট পাস

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে ‘টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট’, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং ই-গেট পাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, ইকুইপমেন্ট ইন্টারচেঞ্জ রিসিপ্ট (ইআইআর) ই-গেট পাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এর ফলে ট্রাক প্রবেশ, পণ্য বোঝাই এবং বন্দর থেকে বের হওয়ার সময়সূচি পূর্বনির্ধারিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হবে।

এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দরে একই সময়ে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমানো এবং পণ্য পরিবহনের সময় আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

কাস্টমস ও লজিস্টিকস কার্যক্রমে এপিআই সংযোগ

কাস্টমসের নিলামজাত পণ্য সরবরাহ, বিশেষ ডেলিভারি কার্যক্রম এবং ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) কার্যক্রম এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআইয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হচ্ছে।

বন্দর সচিব জানান, এর ফলে সংশ্লিষ্ট সব লজিস্টিকস অংশীদারের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে। এতে একই তথ্য বারবার সরবরাহের প্রয়োজন কমবে এবং পণ্য খালাস ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সময় সাশ্রয় হবে।

পাশাপাশি বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিংয়েও ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণাধীন বে-টার্মিনালে যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে স্লটভিত্তিক ডিজিটাল পার্কিং টিকিট ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এক প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন সেবা

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রয়োজনীয় ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে চালু হওয়া বন্দরের ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো-সিপিএ স্কাই’ প্ল্যাটফর্মে একক লগইনের মাধ্যমে বন্দরের বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সুবিধা রয়েছে।

এ প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল রাডার এবং জাহাজের গতিবিধি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের সুবিধাও রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে বন্দরে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মাসে ৬০-৬৫ হাজার গেট প্রবেশ কার্যক্রম

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার গেট প্রবেশ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এক দিনে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮০টি গেট পাস ইস্যুর রেকর্ড রয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, বিদ্যমান ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সব বিভাগ ও সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসা গেলে বন্দরের কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

কমবে সময় ও ব্যয়, বাড়বে স্বচ্ছতা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজ বন্দরে আসা, বিল পরিশোধ, কাস্টমস ছাড়পত্র, পণ্য খালাস এবং চূড়ান্ত সরবরাহ—প্রতিটি ধাপকে একটি সমন্বিত ও অনুসরণযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।

এর ফলে পণ্য খালাসে সময় কমানো, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করা এবং বন্দরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় গতি আনার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে বন্দরের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে যানজট কমিয়ে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, উন্নত বিশ্বের আধুনিক বন্দরগুলোর মতো স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানো। ডিসেম্বরের মধ্যে কাগজবিহীন ও ‘স্মার্ট’ বন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আরও গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন