নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির আয়োজন • ‘কাজী সব্যসাচী: আধুনিক নজরুল আবৃত্তির প্রাণপুরুষ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন • স্মৃতিচারণ করলেন খিলখিল কাজী
বাংলা আবৃত্তিশিল্পকে আধুনিক ও নান্দনিক শিল্পকলার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কাজী সব্যসাচীর অবদান অনন্য বলে মন্তব্য করেছেন কবি, শিল্পী ও গবেষকরা। তাঁদের মতে, বিশেষ করে নজরুলের কবিতার আবৃত্তিতে নিজস্ব কণ্ঠ, উচ্চারণ ও উপস্থাপনার মাধ্যমে স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে ‘কাজী সব্যসাচী: আধুনিক নজরুল আবৃত্তির প্রাণপুরুষ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবৃত্তিশিল্পী ও আইনজীবী নাসিম আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সংগীতশিল্পী ও সংগঠক খিলখিল কাজী এবং আবৃত্তি-গবেষক ও বাচিকশিল্পী নিমাই মণ্ডল।
সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
‘নজরুলের কবিতা আবৃত্তির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী’
স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা, প্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে।
নজরুলের কবিতার ভাষা যেমন তেজোদীপ্ত, তেমনি এর ছন্দ, ধ্বনি ও শব্দবিন্যাস আবৃত্তির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. সেলিম রেজা বলেন, আবৃত্তি কবিতাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নজরুলের কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তি ও বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আবৃত্তিশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
‘আধুনিক আবৃত্তির অনুসরণযোগ্য প্রধান পুরুষ সব্যসাচী’
মূল প্রবন্ধে নাসিম আহমেদ বলেন, কাজী সব্যসাচী তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে আবৃত্তি ও উচ্চারণের শিল্পকে আধুনিক ও নান্দনিক শিল্পকলার মর্যাদায় উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁর মতে, কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠ ছিল ভরাট, পৌরুষদীপ্ত ও মেঘগম্ভীর। নজরুলের কবিতা আবৃত্তির জন্য তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও অন্যান্য কবির রচনা আবৃত্তিতেও অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
নাসিম আহমেদ বলেন, আবৃত্তিশিল্পকে মধ্যবিত্তের ঘর থেকে মাঠ-ময়দান পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কাজী সব্যসাচীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, নজরুল-আবৃত্তির প্রাণপুরুষ হিসেবে কাজী সব্যসাচী যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তেমনি আধুনিক বাংলা আবৃত্তি ও উচ্চারণশিল্পের বিকাশেও তাঁর অবদান দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।
‘আবৃত্তিকে পেশা হিসেবেও নেওয়া যায়, দেখিয়েছেন সব্যসাচী’
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলা আবৃত্তিশিল্পকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কাজী সব্যসাচী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের বহু আবৃত্তিশিল্পী তাঁর আবৃত্তি ও উচ্চারণশৈলী দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি এবং কাজী সব্যসাচীর মেয়ে খিলখিল কাজী তাঁর দাদা ও বাবার স্মৃতিচারণ করেন।
তিনি বলেন, “আবৃত্তিকে ভালোবেসে একজন মানুষ কতটা জনপ্রিয় হতে পারেন, তার উদাহরণ কাজী সব্যসাচী।”
খিলখিল কাজীর মতে, আবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সম্ভাবনাও কাজী সব্যসাচী দেখিয়ে গেছেন। নিজের কণ্ঠ ও উপস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করে আবৃত্তিশিল্পকে শ্রোতাদের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি।
নজরুলের কবিতা ও সব্যসাচীর আবৃত্তির ‘সৃজনশীল সংযোগ’
সভাপ্রধানের বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ইতিহাসের প্রেক্ষাপট এবং নজরুলের কবিতার বৈশিষ্ট্যের আলোকে কাজী সব্যসাচী তাঁর আবৃত্তিকে উপস্থাপন করেছিলেন।
শৈশব থেকেই নজরুলের কবিতা তাঁর আত্মস্থ ছিল উল্লেখ করে মোহাম্মদ আজম বলেন, নজরুলের কবিতার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তির একটি সৃজনশীল সংযোগ তৈরি হয়েছিল।
তাঁর আবৃত্তিতে নজরুলের কবিতার ছন্দ, ধ্বনি, বক্তব্য ও আবেগের স্বতন্ত্র প্রকাশ ঘটেছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
নজরুল বর্ষের আয়োজনে স্মরণ
বাংলা একাডেমির নজরুল বর্ষের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এ সেমিনারে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও বাংলা আবৃত্তির বিকাশে কাজী সব্যসাচীর ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক কাজী রুমানা আহমেদ সোমা।

