শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাংকিং, জ্বালানি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ খাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনীতির গতি কমে গেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
দ্রুত ও সাহসী সংস্কারের তাগিদ
রাজধানীতে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক কার্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনীতির আরও অবনতি ঠেকিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আরও বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানি সংকট কমানো, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।
জ্বালানি খাতে উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সুপারিশ
জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা ফেরাতে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা উন্নত এবং সিস্টেম লস কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের পরামর্শ
আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই দ্রুত শেষ করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকের কার্যকারিতা বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুনর্গঠন করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
ব্যাংক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়াতে আইন ও বিধিবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিয়ন্ত্রক ছাড় ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আমানত সুরক্ষা তহবিলের ব্যবহার আরও স্পষ্ট করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়ার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনে সংস্কার
অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসনের দায়িত্ব আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে সমন্বিত করদাতা তথ্যভান্ডার এবং কর শনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আরও ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে যথাযথভাবে লক্ষ্যভিত্তিক নয়—এমন কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করার পরামর্শ দিয়ে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ভ্যাটের হার একীভূত করা এবং অব্যাহতির সুযোগ কমানোর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ কর ও সম্পত্তি করের প্রশাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
সীমিত সরকারি অর্থ যেন প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বা গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন উপকারভোগী অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও লক্ষ্য নির্ধারণের ঘাটতি কমবে।
ফ্যামিলি কার্ডে আরও ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে রাখার সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও ভালোভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে অতিরিক্ত ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে রাখা সম্ভব।
আর ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা ও খাদ্য কর্মসূচিগুলো সমন্বয় করে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পরিচালনা করা গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
এ জন্য ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, প্রস্তাবিত কৃষক কার্ড এবং অন্যান্য সহায়তা ও ভর্তুকি কর্মসূচির সংযোগ স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের উচিত ব্যাপকভিত্তিক ভর্তুকির পরিবর্তে এমন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া, যা সংকটের সময় দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম। এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের কাছে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক বিভিন্ন ধাক্কা সামলেও অঞ্চলটির অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে বৈশ্বিক চাপ বাড়ার কারণে ২০২৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে অঞ্চলটির দেশগুলোকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন সম্ভাবনা
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
জোহানেস জুট বলেন, দ্রুত সম্প্রসারিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল থেকে সুযোগ নিতে হলে দক্ষতা, অবকাঠামো এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। তবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এ অঞ্চলে এআইয়ের ব্যবহার এখনো অনেক পিছিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কৌশলগত ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করতে পারে।
সংস্কার বাস্তবায়নেই প্রবৃদ্ধি ফেরানোর সুযোগ
বিশ্বব্যাংকের সামগ্রিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা গেলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী অর্থবছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরতে পারে।

