শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৫০০টি হাইস্কুলে পাঠদান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সোমবার দেশটির প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি স্কুলে ক্লাস স্থগিত রাখা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভের কারণে ২৪টি স্কুলে অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে এবং ৭৮ জন শিক্ষা কর্মী আহত হয়েছেন।
শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট ঘিরে আন্দোলন
ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুরু হয় রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠে। শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ সময়ের ক্লাস এবং জরাজীর্ণ ও অপর্যাপ্ত স্কুল অবকাঠামোর অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামে। পরে আন্দোলনটি দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মন্টপেলিয়ার, নানতেস, মার্সেই, লিল, তুলুজসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, স্কুল অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ফ্রান্সে মোট প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি হাইস্কুল রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে এর মধ্যে ৪০০টির বেশি স্কুল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর আগে শুক্রবারও শত শত স্কুলে পাঠদান ব্যাহত হয়েছিল।
২৪ স্কুলে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর, আহত ৭৮ শিক্ষা কর্মী
ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ২৪টি স্কুলে অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুর হয়েছে। এ সময় ৭৮ জন শিক্ষা কর্মী আহত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভে অতি-বামপন্থী কর্মীদের একটি অংশ ঢুকে আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে গেছে। তবে বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলন-সমর্থকদের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
৫ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। শুক্রবার এক দিনেই ১ হাজার ৭৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সোমবারও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। মঙ্গলবার আরও বড় আকারে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, সরকার এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো সমাধানে পর্যাপ্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো মোকাবিলায় সরকার কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকরনু দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা শিক্ষক পদ পূরণ, স্কুল ভবনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্কুল ভবন সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে একটি বিল এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। এতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কারণে সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের অভিভাবকদের আর্থিকভাবে দায়ী করার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে সরকার যেখানে আন্দোলনের সহিংস দিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেখানে শিক্ষার্থী ও তাদের সমর্থকেরা শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে আসছেন। মঙ্গলবারের ঘোষিত বিক্ষোভকে ঘিরে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আবারও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

