সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্ব বাড়ানোর কথা বললেন হুমায়ুন কবির

জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও অর্থনীতিকেন্দ্রিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনীতিকে শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে জাতীয় স্বার্থ

হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন বদলে দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই কৌশলগত ও তীব্র হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে শুধু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও প্রসারের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুবিধা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে বিদেশি মিশনগুলোকে সক্রিয় করার আহ্বান

বাংলাদেশের বিদেশস্থ মিশনগুলোর ভূমিকা প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, এসব মিশনকে নতুন বাজার অনুসন্ধান, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাংলাদেশি পণ্যের প্রচার এবং দেশের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে আরও সক্রিয় হতে হবে।

তার মতে, অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ককে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।

বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় গুরুত্ব

বঙ্গোপসাগরকে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো হলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সীমান্তপারের সহযোগিতার প্রয়োজন

জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য, জ্বালানি, পানি, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জ এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

এসব ক্ষেত্রে সীমান্তপারের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতির চার মূলনীতি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চারটি মূলনীতি তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, জাতীয় স্বার্থ হবে পথপ্রদর্শক, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হবে শক্তি, অংশীদারত্ব সৃষ্টি করবে নতুন সুযোগ এবং শান্তিই থাকবে চূড়ান্ত লক্ষ্য।

তিনি বলেন, এই নীতিগুলোর ভিত্তিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক করার উদ্যোগ নিতে হবে।

তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রতিনিধিরা

সিজিএস আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এ শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জন প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সম্মেলনে সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক ও তরুণ নেতৃত্ব অংশ নেন।

তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এ সম্মেলন সোমবার শেষ হয়। সম্মেলনে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন