সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

হারানো ৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতা ফেরাতে কাপ্তাইয়ে ৮৭০ কোটি টাকার প্রকল্প

দীর্ঘদিনের যান্ত্রিক ও কাঠামোগত জটিলতায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া রাঙামাটির কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট পুনর্বাসনে ৮৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইউনিট দুটির হারানো উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মোট ১০০ মেগাওয়াটের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৬৫৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ, ২০০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা সরকারি তহবিল এবং ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিপিডিবির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের অংশ হিসেবে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

দীর্ঘদিনের জটিলতায় কমেছে উৎপাদন

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট ১৯৮৮ সালে স্থাপন করা হয়। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুটি ইউনিটের সম্মিলিত সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট।

তবে দীর্ঘদিনের ব্যবহার, যান্ত্রিক ও কাঠামোগত সমস্যা এবং পুরোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে বর্তমানে ইউনিট দুটির উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিট থেকে বর্তমানে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দুই ইউনিট মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, সাধারণত এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো নির্দিষ্ট সময় পর পর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বা ওভারহলিং করা প্রয়োজন। কিন্তু ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সেই সংস্কার কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিতভাবে করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ সংস্কার এক দশকেরও বেশি আগে

কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ৪ নম্বর ইউনিটটি সর্বশেষ ২০১০ সালের জুনে এবং ৫ নম্বর ইউনিটটি ২০১১ সালের এপ্রিলে সংস্কার করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় সময় পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকে।

২০১৮ সালে ইউনিট দুটির বড় ধরনের সংস্কার ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক দরপত্র, ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতা এবং কারিগরি শর্ত পূরণের বিষয়সহ বিভিন্ন কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিট দুটি তোশিবা প্রযুক্তিতে নির্মিত হওয়ায় সংস্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ নিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয় এবং কয়েক দফা দরপত্র বাতিল হওয়ার পর সংস্কারকাজ আর এগোয়নি। ফলে পূর্ণাঙ্গ ওভারহলিংয়ের পরিবর্তে জরুরি ও অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে ইউনিট দুটি সচল রাখা হয়েছে।

সংস্কার ও আধুনিকায়নে গুরুত্ব

প্রস্তাবিত পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রোটর রিম সাপোর্ট, স্টেটর কয়েল, রোটর পোল, ইনসুলেশন, টারবাইনের রানার, শ্যাফট সিল ও বিয়ারিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া গভর্নর, অটোমেশন ও কন্ট্রোল সিস্টেম এবং বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। এর মাধ্যমে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার নয়, ইউনিট দুটির নির্ভরযোগ্যতা ও পরিচালন নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় পাঁচ বছর

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, বিপিডিবির নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের সংস্কার ও পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।

তিনি জানান, সংস্কারকাজ শেষ হলে ইউনিট দুটির হারানো উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে পূর্ণ ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে ফেরানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি কমবে এবং কেন্দ্রটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্ষমতা বাড়বে।

জাতীয় গ্রিডে বাড়তে পারে স্বল্প ব্যয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তথ্যমতে, এ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ পয়সা। ফলে পুরোনো ইউনিট দুটির হারানো সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে পারলে জাতীয় গ্রিডে তুলনামূলক কম ব্যয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

দীর্ঘদিনের সংস্কার-ঘাটতি কাটিয়ে ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে সচল করা গেলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সক্ষমতার আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং পরবর্তী ক্রয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন