সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু

পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছেন তার হাজারো সমর্থক। রোববার খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের লাখি মারওয়াত থেকে এ কর্মসূচি শুরু হয়। পিটিআই-শাসিত প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি লংমার্চের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সোমবারও মিছিলটি বিভিন্ন এলাকায় এগিয়ে যায়।

পিটিআই জানিয়েছে, ইসলামাবাদে পৌঁছানোর আগে বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতি করে কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হবে। লংমার্চের পরবর্তী ধাপ নিয়ে ৮ অক্টোবর খাইরাবাদে পৌঁছানোর পর সিদ্ধান্ত জানানোর কথা রয়েছে। এদিকে রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে সরকার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কর্মসূচি

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে লংমার্চটি প্রথমে ২৭ সেপ্টেম্বর শুরু করার পরিকল্পনা করেছিল পিটিআই। তবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার পর কর্মসূচি পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়। কয়েক দফা আলোচনার পরও উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত লংমার্চ শুরু করে পিটিআই।

সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। তিনি দাবি করেছেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিতে সহযোগিতা করতে পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার অনাগ্রহ দেখিয়েছে। এ কারণেই আলোচনা ভেঙে গেছে বলে দাবি তার।

তবে পিটিআই সরকারের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার আলোচনার নামে তাদের ওপর অন্যায্য শর্ত ও ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যেই লংমার্চ শুরু হয়েছে।

‘কারাগারে থাকা নেতার জন্য বেরিয়ে আসুন’

লংমার্চের নেতৃত্ব দেওয়া খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি সমর্থকদের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কারাগারে থাকা তাদের নেতার মুক্তির দাবিতে সবাইকে রাজপথে আসতে হবে, বিশেষ করে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

রোববার লাখি মারওয়াতের গান্ধী চকে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে আফ্রিদি বলেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো নীতি মেনে নেবে না তার সরকার। তিনি কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানান।

সোমবার করাক এলাকায়ও সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন আফ্রিদি। সেখানে তিনি কেন্দ্রের সন্ত্রাসবিরোধী নীতির সমালোচনা করেন এবং প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেন।

ইসলামাবাদ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা

লংমার্চকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদ ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এলাকা ঘিরে সড়কে কনটেইনার বসিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। পার্লামেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এবং বিদেশি দূতাবাসগুলো অবস্থিত ওই এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।

সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, লংমার্চে অংশ নেওয়া লোকজনকে ইসলামাবাদের সরকারি এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেছেন, রাজধানীতে অনির্দিষ্টকাল ধরে বিক্ষোভ বা ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

লংমার্চের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এর আগেই পাকিস্তানের বিভিন্ন সড়কে কনটেইনার দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে দেশের পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

আগের বিক্ষোভে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের নজির

ইমরান খানের দল এর আগে বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করলেও তা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গড়িয়েছিল। ২০২৩ সালে ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ হয় এবং তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার অভিযোগ ওঠে। এরপর পিটিআইয়ের বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচারও হয়।

রয়টার্স জানিয়েছে, ইমরান খানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় সাজা হয়েছিল। তবে তার অধিকাংশ সাজা পরে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে এবং কয়েকটি মামলার আপিল এখনও বিচারাধীন। ইমরান নিজেকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে দাবি করে আসছেন। অন্যদিকে সরকার ও সামরিক বাহিনী এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে।

সন্ত্রাসবিরোধী নীতি নিয়ে নতুন বিরোধ

লংমার্চকে কেন্দ্র করে পিটিআই ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জঙ্গি হামলা বেড়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি অভিযোগ করেছেন, সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রীয় নীতির বাস্তবায়নে পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার সহযোগিতা করছে না। সরকার এমনও ইঙ্গিত দিয়েছে যে প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তানীতি অনুসরণে ব্যর্থ হলে আইন ও সংবিধানের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

তবে পিটিআই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও নীতিগত মতপার্থক্যকে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে শুরু হওয়া এই লংমার্চ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে পিটিআই সমর্থকেরা ইসলামাবাদে বড় সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার রাজধানীতে তাদের প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

আগের বিক্ষোভে সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনার কারণে লংমার্চটি ইসলামাবাদের দিকে যত এগোবে, পরিস্থিতি ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পিটিআই তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং সরকারও রাজধানীতে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার অবস্থানে অনড় রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন