একসময় তালপাতায় অক্ষর লেখা, দোয়াত-কালিতে হাতেখড়ি আর কাঠের পাটিতে বসিয়ে গ্রামের শিশুদের শিক্ষার প্রথম পাঠ দিতেন তিনি। পারিশ্রমিক হিসেবে নিতেন মাত্র ১০ টাকা। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুর হাতে শিক্ষার প্রথম অক্ষর তুলে দিয়ে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘দশ টাকার মাস্টার’ নামে। সেই প্রবীণ শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহি এখন জীবনের শেষপ্রান্তে এসে জরাজীর্ণ ঘরে আর্থিক সংকটের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তার দুরবস্থার খবর পেয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুণ্ড গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আলী সুজা। এ সময় তিনি প্রবীণ এই শিক্ষকের খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তার হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় হস্তিশুণ্ড গ্রামের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের শিক্ষাজীবনের সূচনা হতো শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহির হাত ধরে। তালপাতায় অক্ষর লেখা, দোয়াতে কালি তৈরি করা এবং শিশুদের হাতে ধরে অক্ষর শেখানোর মধ্য দিয়ে শুরু হতো তার পাঠদান। কাঠের পাটিতে বসিয়ে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতেন তিনি। এর বিনিময়ে নিতেন মাত্র ১০ টাকা। ফলে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে তিনি ‘দশ টাকার মাস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পান।
নব্বইয়ের দশকে গ্রামের অসংখ্য শিশুকে শিক্ষার প্রথম পাঠ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মনিরুজ্জামান এলাহি। তার কাছে হাতেখড়ি নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। একটি প্রজন্মের শিক্ষার সূচনালগ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই শিক্ষক নিজের জীবনের বড় একটি সময় অন্যের সন্তানদের শিক্ষাদানে ব্যয় করেছেন।
তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই শিক্ষকই আজ অসহায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন তিনি। নেই স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস, নেই নিয়মিত সরকারি সহায়তাও। জরাজীর্ণ বাড়িতে আর্থিক সংকটের মধ্যে কষ্টে দিন কাটছে তার।
স্থানীয় শিক্ষক নুরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, মনিরুজ্জামান এলাহির কাছে হাতেখড়ি নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একটি প্রজন্মের জন্য তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সেই শিক্ষকের নিজের জীবনই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
তিনি জানান, মনিরুজ্জামান এলাহি বিয়ে করেননি। শিক্ষাদানকেই জীবনের বড় অংশজুড়ে সঙ্গী করে নিয়েছিলেন তিনি। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার প্রথম অক্ষর চিনিয়ে দেওয়াকেই জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। অথচ বর্তমানে তার কোনো স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা নেই।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রবীণ এই শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে ইউএনও মো. আলী সুজা তার সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি শিক্ষকের শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক পরিস্থিতি ও জীবনযাপনের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। পরে তার হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পরই তিনি ‘দশ টাকার মাস্টার’ মনিরুজ্জামান এলাহির খোঁজ নিয়েছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বাড়িতে গিয়েছিলেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবীণ এই শিক্ষককে আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জীবনের শেষপ্রান্তে শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহির একটি ঘরের প্রয়োজন রয়েছে। তার শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি ঘর নির্মাণে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যে মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় গ্রামের শিশুদের হাতে শিক্ষার প্রথম অক্ষর তুলে দিয়েছেন, তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন অনিশ্চয়তা ও অভাবের মধ্যে না কাটে—এটাই এখন তাদের প্রত্যাশা। এক প্রজন্মের শিক্ষার নীরব কারিগর মনিরুজ্জামান এলাহির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

