ইয়েমেনে চলমান সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া এসব মানুষের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও রয়েছেন। সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার একবার নয়, দুই, তিন এমনকি চারবার পর্যন্ত নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। বারবার স্থান পরিবর্তনের ফলে এসব মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আশ্রয়, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন জেলা ও এলাকায় সংঘর্ষের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন। তাঁদের অনেকে তাইজ ও এডেন গভর্নরেটের মধ্যবর্তী এলাকায় স্থাপিত বিভিন্ন বাস্তুচ্যুতি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এসব শিবিরে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে প্রতিকূল পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছে।
আশ্রয়শিবিরে মানবিক সংকট
সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা মানুষের জন্য আশ্রয়শিবিরগুলোও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক জীবন নিশ্চিত করতে পারছে না। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিবিরে থাকা তাঁবুগুলো বসবাসের উপযোগী নয়। পাশাপাশি খাবারসহ মৌলিক প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতিও রয়েছে। ফলে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোর সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
বাসস্থান হারানোর পাশাপাশি খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকট এসব মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শিবিরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে।
বাড়ি থেকে দূরে দিন কাটছে শিশুদের
বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে শিশুদের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিবিরে আশ্রয় নেওয়া অনেক শিশু ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে নিজেদের বাড়ি থেকে দূরে রয়েছে। অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে তাদের দিন কাটছে।
খাদ্যসংকটের কারণে কিছু শিশু আশপাশের উপত্যকা থেকে শস্য ও বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ সংগ্রহ করছে। পরে সেগুলো আগুনে রান্না করে খাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুদের খাবারের জন্য এভাবে প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হওয়া শিবিরগুলোর জীবনযাত্রার সংকটের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
সংঘর্ষের কারণে বাড়িঘর ছেড়ে আসা এসব শিশুর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক প্রয়োজন পূরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা পুষ্টির অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
শিবিরের কাছেই সংঘর্ষের শব্দ
ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েও পুরোপুরি নিরাপত্তা পাচ্ছেন না বাস্তুচ্যুত মানুষেরা। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিবিরগুলোর কাছাকাছি পাহাড়ের ওপাশ থেকে এখনো সংঘর্ষের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধ ও সংঘর্ষ থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে ঘর ছাড়লেও অনেকের কাছে সেই নিরাপত্তা এখনো অনিশ্চিত। সংঘর্ষের পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে গেলে নতুন করে স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বারবার বাস্তুচ্যুতিতে বাড়ছে দুর্ভোগ
ইয়েমেনের চলমান সংঘর্ষের প্রভাবে বহু পরিবার একাধিকবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই স্থানান্তরের সংখ্যা দুই, তিন কিংবা চারবার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবার স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন করে আশ্রয় খোঁজা, খাবার সংগ্রহ এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ফলে পরিবারগুলোর স্থিতিশীল জীবনযাপনের সুযোগ কমে যায়। এক জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার পর আবারও পালাতে হলে সঙ্গে থাকা সামগ্রী হারানো কিংবা নতুন করে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; মানুষের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন
বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিবিরগুলোতে আশ্রয় ও মৌলিক সামগ্রীর ঘাটতি ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাবার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে শিবিরগুলোর আশপাশে সংঘর্ষের ঝুঁকি থাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন এবং বিদ্যমান শিবিরগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনে সংঘর্ষের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অনেক পরিবারের বারবার ঘর ছাড়ার ঘটনা দেশটির বেসামরিক জনগোষ্ঠীর দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরছে। অনুপযোগী তাঁবু, মৌলিক সামগ্রীর ঘাটতি, শিশুদের খাদ্যসংকট এবং শিবিরের কাছাকাছি সংঘর্ষের শব্দ—সব মিলিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাঁদের নিরাপত্তা ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে জরুরি মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সংঘর্ষের ঝুঁকি কমানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

