রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পোশাকের পর প্রযুক্তি—নতুন রপ্তানি শক্তি হতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

সফটওয়্যার থেকে চিপ ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং থেকে দেশেই মাদারবোর্ড উৎপাদন—বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রযুক্তির মানচিত্র

বিশেষ প্রতিবেদন | প্রান্তকাল

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত ‘তথ্যপ্রযুক্তি’। একসময় যে দেশে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন কিংবা অধিকাংশ প্রযুক্তিপণ্যের জন্য আমদানিই ছিল প্রধান ভরসা, সেই বাংলাদেশে এখন সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযুক্তিসেবা দেওয়া হচ্ছে, তরুণেরা ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন, মাদারবোর্ড তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইনের উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি চলছে।

তবে সম্ভাবনার এই চিত্রের পাশাপাশি বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সরকারি ও শিল্পখাতের উৎসে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক আয়ের হিসাবের সংজ্ঞা এক নয়। কোথাও সফটওয়্যার, কোথাও IT-enabled services (ITES), BPO এবং ফ্রিল্যান্সিংও যোগ করা হয়। ফলে বহুল প্রচারিত কোনো একটি অঙ্ককে সরাসরি ‘সফটওয়্যার রপ্তানি’ হিসেবে দেখানো বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে—বাংলাদেশ প্রযুক্তিতে এগোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী বড় পরীক্ষা হবে কম মূল্যের আউটসোর্সিং থেকে উচ্চমূল্যের নিজস্ব প্রযুক্তি, পণ্য, মেধাস্বত্ব ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণ।

সফটওয়্যার ও ITES: ৮০টির বেশি দেশে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম Invest Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৫০টির বেশি IT প্রতিষ্ঠান ৮০টির বেশি দেশে সেবা রপ্তানি করছে। প্রধান বাজারের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, ভারত, নেদারল্যান্ডস এবং কয়েকটি নর্ডিক দেশ।

বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু সাধারণ ডেটা এন্ট্রি বা ব্যাক-অফিস সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ, UI/UX, AI ও machine learning, cybersecurity, IoT, embedded systems এবং enterprise software-সহ তুলনামূলক উচ্চমূল্যের কাজেও সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। Invest Bangladesh দেশীয় IT services market-এর ২০২৫ সালের সম্ভাব্য আকার প্রায় ২.১১ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেছে। তবে এটি রপ্তানি আয় নয়; বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ IT services বাজারের একটি প্রক্ষেপণ।

BASIS-এর ওয়েবসাইটেও ICT খাতের রপ্তানির একটি বিস্তৃত হিসাব প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের শিল্পখাতভিত্তিক বিস্তৃত হিসাবের সঙ্গে EPB-এর আনুষ্ঠানিক সেবা-রপ্তানি পরিসংখ্যানের সংজ্ঞাগত পার্থক্য রয়েছে। তাই একই প্রতিবেদনে সংখ্যাগুলো ব্যবহার করার সময় তাদের পরিধি আলাদা করে দেখা জরুরি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ইতোমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ের পণ্য ও সেবা রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি খাত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এখন পূর্ণ অর্থবছরের সরকারি ডেটা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

প্রযুক্তি রপ্তানিতে ৬ শতাংশ প্রণোদনা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের নীতিতে সফটওয়্যার, IT-enabled services এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি রপ্তানিতে ৬ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বহাল রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য হার ২.৫ শতাংশ। এই সুবিধা ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রযোজ্য বলে Invest Bangladesh-এর হালনাগাদ তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রযুক্তি খাতের প্রধান কাঁচামাল মূলত মানুষের দক্ষতা ও মেধা। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিপরীতে তৈরি পোশাক বা অন্য অনেক শিল্পের মতো বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন হয় না।

ফ্রিল্যান্সিং: এখন সরকারি পরিচয়ের আওতায়

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশগুলোর একটি ফ্রিল্যান্সিং।

Invest Bangladesh বর্তমানে দেশে ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারের তথ্য উল্লেখ করছে। তবে ‘নিবন্ধিত’, ‘সক্রিয়’ এবং আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট থাকা ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা একই বিষয় নয়—তাই সংখ্যাটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন।

২০২৬ সালে এ খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়েছে Freelancer ID ব্যবস্থা।

সরকারের freelancers.gov.bd প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সাররা সরকার স্বীকৃত ডিজিটাল পরিচয় পাচ্ছেন। এই পরিচয় পেশাগত অবস্থান ও আয়ের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা এবং ব্যাংকিং ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় প্রবেশ সহজ করার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে।

সরকারি সেবা তথ্য অনুযায়ী, Freelancer ID তিন বছরের জন্য বৈধ এবং ID পেতে বা নবায়ন করতে আগের ১২ মাসে অন্তত ৫০ মার্কিন ডলার যাচাইকৃত আয় থাকতে হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু IT freelancing নয়, সব ধরনের freelancing income-এর জন্য আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে content creation থেকে অর্জিত আয়কেও করমুক্ত রাখার প্রস্তাব এসেছে।

সবচেয়ে বড় নতুন সম্ভাবনা: সেমিকন্ডাক্টর

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী নতুন ক্ষেত্র সম্ভবত semiconductor বা চিপ শিল্প।

BIDA-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০০-এর বেশি chip designer রয়েছেন এবং প্রতিবছর CSE ও EEE থেকে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক হচ্ছেন।

২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের semiconductor-related export ছিল ৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি। বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এই ১ বিলিয়ন ডলার এখনো অর্জন নয়—এটি শিল্পখাতের লক্ষ্যমাত্রা।

বাংলাদেশ এখনই তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পূর্ণাঙ্গ semiconductor fabrication plant বা ‘fab’ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামছে না। বরং প্রাথমিকভাবে IC design, chip testing, assembly, OSAT এবং advanced packaging-এর মতো তুলনামূলক বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২০২৫ সালে BIDA-এর নেতৃত্বে National Semiconductor Taskforce গঠন করা হয়। এর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দক্ষতা ও নীতিগত ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং chip design, testing ও assembly সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ কাঠামোর সুপারিশ করা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে semiconductor design, testing ও packaging-এর নির্দিষ্ট কাঁচামালের ওপর মাত্র ১ শতাংশ customs duty রেখে regulatory duty, supplementary duty, VAT ও advance tax থেকে ছাড়ের ব্যবস্থা ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য শুধু সফটওয়্যার লেখা নয়—বিশ্বের electronics supply chain-এর একটি অংশ হওয়ার চেষ্টাও এখন নীতিগত পর্যায়ে স্পষ্ট।

স্টার্টআপ: ১২ ডিলে ১২৪ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু ছবিটা যতটা বড় দেখায় ততটা নয়

বাংলাদেশের startup ecosystem নিয়েও আশাবাদের পাশাপাশি সতর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

Startup Bangladesh-এর Startup Investment Report—Year in Review 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো ১২টি চুক্তিতে প্রায় ১২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। ২০২৪ সালে পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার।

প্রথম দেখায় এটি বড় উল্লম্ফন।

কিন্তু পুরো ছবিটি ভিন্ন।

১২৪ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১১০ মিলিয়ন ডলারই এসেছে SILQ Group গঠনকে কেন্দ্র করে একটি বড় late-stage/M&A transaction থেকে। শীর্ষ তিনটি লেনদেন মোট বিনিয়োগের প্রায় ৯৫ শতাংশ। ফলে ২০২৫ সালের বৃদ্ধিকে পুরো startup ecosystem-এর বিস্তৃত পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো—মোট বিনিয়োগের প্রায় ৯৯ শতাংশ এসেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অবদান তিনটি চুক্তিতে এক মিলিয়ন ডলারেরও কম। Startup Bangladesh-এর নিজস্ব বিশ্লেষণও early-stage funding-এর দুর্বলতা এবং স্থানীয় venture capital-এর সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখিয়েছে।

২০২৬ সালে এই সমস্যার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের চেষ্টা শুরু হয়েছে।

গত ১৬ আগস্ট Startup Bangladesh Bangladesh Fund of Funds-এর কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রাথমিক আকার ৪০০ কোটি টাকা। এখানে সরকার সরাসরি শুধু পৃথক startup-এ বিনিয়োগ না করে নির্বাচিত professional venture capital fund manager-এর মাধ্যমে মূলধন বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৬-২৭ বাজেটে startup ও প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্যোগের জন্য ৫০০ কোটি টাকার Startup Fund প্রস্তাব করা হয়েছে।

হাই-টেক পার্ক: অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, এখন প্রশ্ন ব্যবহার ও বিনিয়োগের

দেশজুড়ে হাই-টেক পার্ক নির্মাণ বাংলাদেশের প্রযুক্তিনীতির অন্যতম বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ।

Bangladesh Hi-Tech Park Authority-এর DEIED তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ২৮টি Hi-Tech Park, Software Technology Park এবং IT Training & Incubation Center স্থাপন করা হয়েছে; এর মধ্যে চারটি সম্পন্ন ও চালু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই উৎসে ১১০টি কোম্পানিকে জায়গা বরাদ্দ এবং বিভিন্ন পার্কে ১৩ হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থানের তথ্য রয়েছে, যদিও কর্মসংস্থানের কিছু উপাত্ত পুরোনো সময়ভিত্তিক—তাই এগুলোকে ২০২৬ সালের নতুন কর্মসংস্থান হিসেবে দেখা যাবে না।

কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত চিত্র আরও নির্দিষ্ট।

সরকারি বার্তা সংস্থা BSS-এর প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪০টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে এবং আরও ২৮টি কারখানা স্থাপনের পর্যায়ে রয়েছে।

পার্কটিতে প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগ প্রায় ১.৬৩৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বাস্তবায়িত বিনিয়োগ প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ‘প্রস্তাবিত বিনিয়োগ’ আর ‘বাস্তবে বিনিয়োগ’ এক নয়—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

আইসিটি বিভাগের বর্তমান প্রকল্প তালিকায় ১১টি IT Training and Incubation Center, ১২ জেলায় IT/Hi-Tech Park এবং Hi-Tech City-2-এর অবকাঠামোসহ একাধিক প্রকল্প এখনো চলমান বা মেয়াদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

‘Made in Bangladesh’ প্রযুক্তি: মাদারবোর্ড যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে

বাংলাদেশের প্রযুক্তি অগ্রগতির সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন হচ্ছে hardware manufacturing-এ।

২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশে তৈরি Printed Circuit Board Assembly (PCBA) বা motherboard যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি শুরু করেছে Walton। সরকারি বার্তা সংস্থা BSS জানায়, গাজীপুরের চন্দ্রায় প্রতিষ্ঠানটির কারখানা থেকে এই রপ্তানির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

এটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ এতদিন প্রধানত তৈরি পোশাকের মতো শ্রমঘন পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত। দেশে তৈরি motherboard আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়া উচ্চপ্রযুক্তির manufacturing value chain-এ বাংলাদেশের প্রবেশের একটি বাস্তব উদাহরণ।

কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কেও বর্তমানে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, fibre-optic cable, IoT device, router, switch, CCTV equipment, ATM ও cash recycler machine-সহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। Honor ও Xiaomi-সহ তিনটি মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক এবং দুটি laptop manufacturer সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে আগস্টে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

তবে এখানে আরেকটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশে assembly হওয়া, local value addition এবং সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি/IP দিয়ে পণ্য তৈরি—এই তিনটি একই বিষয় নয়।

বাংলাদেশের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন শুধু assembly নয়, design, engineering, component manufacturing এবং intellectual property-এর অংশ বাড়ানো।

বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রযুক্তিও তৈরি হচ্ছে

প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বাংলা ভাষা।

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অধীনে ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পে প্রায় ১৫৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির নির্ধারিত সময়সীমা ছিল জুলাই ২০১৬ থেকে জুন ২০২৬।

BCC-এর প্রকাশিত প্রযুক্তির তালিকায় Bangla-to-IPA এবং IPA-to-Bangla software-সহ বিভিন্ন নিজস্ব ডিজিটাল সেবা ও সফটওয়্যার রয়েছে।

AI যুগে এই কাজের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ বাংলা ভাষার বড় ও মানসম্পন্ন dataset, speech recognition, OCR, text-to-speech, machine translation এবং large language model-এর সক্ষমতা ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাভিত্তিক AI ecosystem তৈরির ভিত্তি হতে পারে।

২০২৬-২৭ বাজেটে প্রযুক্তি উৎপাদনে নতুন সুবিধা

চলতি অর্থবছরের বাজেটেও স্থানীয় technology manufacturing-কে উৎসাহিত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের raw material-এর Advance Income Tax কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে mobile phone, computer, laptop ও printer তৈরিতে শর্তসাপেক্ষ VAT exemption ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

Computer ও digital device তৈরির raw materials এবং components-এর duty সুবিধাও ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এসব সুবিধার মূল প্রশ্ন হবে—এগুলো কতটা প্রকৃত local value addition, প্রযুক্তি স্থানান্তর, R&D এবং দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ

সব ইতিবাচক সূচকের পরও কয়েকটি দুর্বলতা স্পষ্ট।

প্রথমত, বাংলাদেশের IT ও startup খাতে উচ্চমূল্যের নিজস্ব intellectual property এখনো সীমিত।

দ্বিতীয়ত, freelancing-এ বিপুল জনবল থাকলেও কম-মূল্যের কাজ থেকে AI, cloud, cybersecurity, data engineering, semiconductor design ও advanced software engineering-এর মতো উচ্চমূল্যের দক্ষতায় দ্রুত উত্তরণ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, startup investment-এর বড় অংশ বিদেশি মূলধননির্ভর এবং early-stage অর্থায়ন এখনো দুর্বল। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানেই এর স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

চতুর্থত, হাই-টেক পার্কে জায়গা বরাদ্দ বা investment proposal-কে বাস্তব উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে হবে।

পঞ্চমত, hardware manufacturing-এ assembly থেকে ধীরে ধীরে নিজস্ব design, component, R&D এবং patent/IP ownership-এর দিকে যেতে হবে।

তাহলে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

২০২৬ সালের তথ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত এখন আর শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়। কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু হয়েছে।

দেশে সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে, শত শত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছে; কয়েক লাখ মানুষ freelancing-এর সঙ্গে যুক্ত; সরকার তাদের আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের ব্যবস্থা করেছে; semiconductor ecosystem তৈরির জন্য জাতীয় taskforce হয়েছে; দেশে শত শত chip designer-এর মানবসম্পদভিত্তি তৈরি হয়েছে; startup financing-এর নতুন কাঠামো চালু হয়েছে; আর বাংলাদেশে তৈরি motherboard যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পৌঁছেছে।

তবে ‘প্রযুক্তি শক্তি’ হয়ে ওঠার পথ এখনো দীর্ঘ।

সাফল্যের আসল মাপকাঠি হবে—বাংলাদেশ কতগুলো হাই-টেক পার্ক বানাল, সেটি নয়; সেখান থেকে কত প্রযুক্তিপণ্য ও মেধাস্বত্ব তৈরি হলো।

কতজন ফ্রিল্যান্সার আছে, সেটিও একমাত্র মাপকাঠি নয়; তারা বিশ্ববাজারে কত উচ্চমূল্যের কাজ পাচ্ছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

মোবাইল বা ল্যাপটপ দেশে সংযোজন হচ্ছে কি না, শুধু সেটিও নয়; তার design, motherboard, chip, software ও intellectual property-এর কতটা বাংলাদেশের, সেটিই ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন।

আর সেমিকন্ডাক্টরে ২০৩০ সালের এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন chip design থেকে testing, packaging ও engineering services পর্যন্ত একটি টেকসই দেশীয় ecosystem গড়ে উঠবে।

তাই বাংলাদেশের প্রযুক্তির পরবর্তী অধ্যায় সম্ভবত ‘Digital Bangladesh’ থেকে ‘Technology Made in Bangladesh’—ব্যবহারকারী থেকে নির্মাতা, outsourcing থেকে innovation এবং assembly থেকে intellectual property-ভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের অধ্যায়।

সেই উত্তরণ কত দ্রুত এবং কতটা টেকসই হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রযুক্তি বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রপ্তানি শক্তি হয়ে উঠতে পারবে কি না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন