অনুসরণ করুন:
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এবার মহাকাশে গুগলের AI চিপ, কক্ষপথে ডেটা সেন্টার গড়ার পথে নতুন পরীক্ষা

পৃথিবীর বিদ্যুৎ ও জমির সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে মহাকাশে সৌরশক্তিনির্ভর AI কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরির সম্ভাবনা যাচাই • Project Suncatcher-এর প্রথম কক্ষপথ পরীক্ষা • মহাকাশে যাচ্ছে Google-এর TPU • ২০২৭ সালে আরও দুই স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা

প্রযুক্তি ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান কম্পিউটিং চাহিদা সামলাতে এবার পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের দিকে এগোচ্ছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটি তাদের Project Suncatcher-এর আওতায় প্রথমবারের মতো নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চিপ মহাকাশে পাঠিয়ে পরীক্ষা করতে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে মহাকাশে বড় আকারের AI কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব কি না, সেটিই এই উদ্যোগের মূল অনুসন্ধান।

গুগলের ঘোষণা অনুযায়ী, একটি প্রোটোটাইপ স্যাটেলাইটে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষায়িত Tensor Processing Unit (TPU) পাঠানো হবে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বা Low Earth Orbit-এ। স্যাটেলাইট নির্মাণ ও মিশনে গুগলের সহযোগী হিসেবে রয়েছে স্যাটেলাইট কোম্পানি Planet। এটি SpaceX-এর আসন্ন Transporter-18 রাইডশেয়ার মিশনের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য এখনই মহাকাশে পূর্ণাঙ্গ ডেটা সেন্টার চালু করা নয়। বরং রকেট উৎক্ষেপণের তীব্র কম্পন ও চাপ, মহাকাশের বিকিরণ এবং চরম তাপমাত্রার মতো প্রতিকূল পরিবেশে গুগলের AI চিপ নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে কি না—তা বাস্তবে যাচাই করা হবে।

কেন মহাকাশে AI ডেটা সেন্টার?

AI মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা এবং বিদ্যুৎ প্রয়োজন। পৃথিবীতে বড় ডেটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুৎ, জমি ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে গুগলের গবেষকেরা মহাকাশকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে পরীক্ষা করছেন।

গুগলের হিসাবে, নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকা স্যাটেলাইট প্রায় অবিরাম সূর্যালোক পেতে পারে এবং পৃথিবীর তুলনীয় ব্যবস্থার চেয়ে সর্বোচ্চ আট গুণ বেশি সৌরশক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে একাধিক AI-চিপসমৃদ্ধ স্যাটেলাইটকে উচ্চগতির অপটিক্যাল বা লেজার সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত করা গেলে মহাকাশেই বড় AI workload পরিচালনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

মহাকাশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত বাধাও কম নয়। প্রথম বড় পরীক্ষা হলো উৎক্ষেপণ। রকেটে মহাকাশে যাওয়ার সময় স্যাটেলাইটকে প্রচণ্ড কম্পন ও ত্বরণ সহ্য করতে হয়। গুগল জানিয়েছে, তারা পৃথিবীতে এ ধরনের পরিস্থিতি অনুকরণ করে হার্ডওয়্যারের vibration test করেছে।

আরেকটি বড় সমস্যা মহাজাগতিক বিকিরণ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে উচ্চশক্তির কণা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে। গুগল University of California, Davis-এর Crocker Nuclear Laboratory-তে proton beam ব্যবহার করে AI workload চালু থাকা অবস্থায় তাদের Trillium TPU পরীক্ষা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পরীক্ষার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তব মহাকাশ পরিবেশে পরীক্ষা করাই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাতাস নেই, ঠান্ডা হবে কীভাবে?

মহাকাশে AI ডেটা সেন্টার তৈরির ক্ষেত্রে আরেকটি জটিল সমস্যা হলো তাপ নিয়ন্ত্রণ। শক্তিশালী AI প্রসেসর প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। পৃথিবীর ডেটা সেন্টারে বাতাস বা তরলভিত্তিক বিভিন্ন কুলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা গেলেও মহাশূন্যের vacuum-এ প্রচলিত airflow cooling কাজ করে না।

এ কারণে গুগল heat pipes ও radiators মিলিয়ে বিশেষ তাপ অপসারণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। পৃথিবীতে thermal vacuum chamber-এ এর পরীক্ষা হয়েছে; এবার প্রকৃত মহাকাশ পরিবেশে প্রযুক্তিটি কেমন কাজ করে, সেই তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

২০২৭ সালে আরও বড় পরীক্ষা

প্রথম মিশন সফল হলে Project Suncatcher আরও বড় পরীক্ষার দিকে যাবে। গুগলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে দুটি স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠিয়ে তাদের মধ্যে high-bandwidth laser link পরীক্ষা করা হবে। ভবিষ্যতে অনেক স্যাটেলাইটকে এভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেই বড় AI computing cluster তৈরির ধারণা নিয়ে গবেষণা চলছে।

তবে কক্ষপথে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর ডেটা সেন্টার তৈরি এখনো অনেক দূরের বিষয়। উচ্চ উৎক্ষেপণ ব্যয়, স্যাটেলাইট উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, তাপ নিয়ন্ত্রণ, বিকিরণ এবং মহাকাশে নষ্ট হওয়া যন্ত্র মেরামত বা প্রতিস্থাপনের জটিলতা—সবই বড় বাধা। Reuters-এর প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, ধারণাটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে।

Project Suncatcher-এর প্রথম কক্ষপথ পরীক্ষা তাই কোনো পূর্ণাঙ্গ ‘মহাকাশ ডেটা সেন্টার’ উদ্বোধন নয়। এটি মূলত একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার শুরু—পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে কি ভবিষ্যতের বিশাল AI কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব?

এই পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতের AI অবকাঠামোর ধারণায় বড় পরিবর্তনের পথ খুলতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন