শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এআই বিপর্যয়ের সতর্কতা বাড়ছে, তবু গতি কমাতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র-চীন

মানবনিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক প্রযুক্তি নেতারা • উন্নয়ন ধীর করার আহ্বানে সাড়া নেই দুই পরাশক্তির • জাতিসংঘে বৈশ্বিক নজরদারির দাবি • এআই নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতার সম্ভাবনা সীমিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ একপর্যায়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে—বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের একটি অংশ যখন এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, ঠিক তখনই এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করছে প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে থাকা দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও কেউই প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের দাবি জোরালো হলেও বাস্তবে একটি কার্যকর বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হয়ে উঠছে।

কেন হঠাৎ এত উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে অত্যাধুনিক এআই মডেলের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া, অনুমোদন ছাড়াই ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং কম্পিউটার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের পরীক্ষামূলক ঘটনার খবর এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাত্র কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে এআই শিল্পের ভেতর থেকেই প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নজিরবিহীন উদ্বেগ সামনে এসেছে। Anthropic-এর একজন গবেষক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এআই উন্নয়নের বর্তমান গতিকে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন। এআই মানুষের তত্ত্বাবধান ছাড়াই আরও সক্ষম এআই তৈরি করতে পারার পর্যায়ে পৌঁছানো—যাকে ‘recursive self-improvement’ বলা হয়—বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি।

গতি কমানোর পক্ষে প্রযুক্তি দুনিয়ার প্রভাবশালী অংশ

এআই উন্নয়নের বর্তমান গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারীদের মধ্যে রয়েছেন Anthropic-এর প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেই এবং OpenAI-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানসহ প্রযুক্তি খাতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

তাঁদের একটি অংশ মনে করেন, সবচেয়ে শক্তিশালী বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় কিছুটা লাগাম টানা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।

তবে প্রযুক্তি খাতেই এ বিষয়ে ঐকমত্য নেই। Nvidia-এর প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং ও Meta-এর প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কঠোর বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন এবং এআইয়ের সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

গতি কমাতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এআই এখন কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রচেষ্টার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি এআই নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক কাঠামোর বিরোধিতা করেন।

ওয়াশিংটনের বড় উদ্বেগ হলো—যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করলে চীন সেই সুযোগে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়ে ফেলতে বা এগিয়ে যেতে পারে। ফলে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

চীনের উদ্বেগ আবার ভিন্ন

চীন এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি রাষ্ট্রীয় নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তুললেও প্রযুক্তির উন্নয়ন ধীর করার প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি।

বেইজিংয়ের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য একচ্ছত্র আধিপত্য।

চীনা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে ‘এআই নিরাপত্তা’র যুক্তি ব্যবহার করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও প্রযুক্তিবাজারে চীনের প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করার চেষ্টা হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাকে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘে উঠেছে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের দাবি

এআই নিয়ে উদ্বেগ এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও স্বাধীন নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সময়ে জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরসহ ২০টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এআই যেন মানুষের নির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে থাকে—সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রস্তাবের মধ্যে অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড, গুরুতর এআই দুর্ঘটনার তথ্য বিনিময় এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান তৈরির বিষয়ও রয়েছে।

তবে বিশ্বের দুই প্রধান এআই শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ওই যৌথ উদ্যোগে যোগ দেয়নি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও এআই

বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এআইয়ের সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। সেখানে OpenAI-এর স্যাম অল্টম্যান, Anthropic-এর ডারিও আমোদেই এবং Hugging Face-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্লেমঁ দেলাংসহ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের ব্রিফ করার কথা।

Reuters জানিয়েছে, অল্টম্যান বিশ্বনেতাদের কাছে উন্নত এআইয়ের সক্ষমতা পরিমাপ এবং কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়নের জন্য অভিন্ন মানদণ্ড তৈরির আহ্বান জানাবেন।

সবচেয়ে বড় ভয় ‘নিজেকে নিজেই আরও শক্তিশালী করা’

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এমন এক পর্যায় নিয়ে, যখন অত্যাধুনিক এআই মানুষের সরাসরি সহায়তা ছাড়াই নিজের চেয়ে আরও উন্নত এআই তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ ধরনের পুনরাবৃত্ত স্ব-উন্নয়ন শুরু হলে প্রযুক্তিটির সক্ষমতা কত দ্রুত বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ তার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না—সে বিষয়ে নিশ্চিত উত্তর নেই।

এই কারণেই কিছু এআই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এমন ‘রেড লাইন’ নির্ধারণের প্রস্তাব করছেন, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সক্ষমতার এআই তৈরি না করার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর বৈশ্বিক এআই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অত্যাধুনিক এআই গবেষণা, মডেল এবং কম্পিউটিং অবকাঠামোর বড় অংশ এই দুই দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

দুই দেশের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ঘটনা সম্পর্কে একে অপরকে জানানোর মতো সীমিত কিছু ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোন ধরনের এআই সক্ষমতা গ্রহণযোগ্য নয়, কীভাবে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা হবে এবং কোনো দেশ চুক্তি ভাঙছে কি না তা কীভাবে যাচাই করা হবে—এসব মৌলিক প্রশ্নে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে।

ফলে বিশ্ব এখন এক ধরনের দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে এআই চিকিৎসা, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে; অন্যদিকে একই প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগও বাড়াচ্ছে।

আর সেই ঝুঁকি সামলানোর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন এক প্রতিযোগিতা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—কেউই আগে গতি কমিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে চাইছে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন