৪০ বছর আগে একই হলে ছিলেন সহযোগী, এবার ১৯৩ দেশের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে • বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে অধিবেশন পরিচালনা • উদ্বোধনী বক্তব্যে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও আস্থা পুনর্গঠনের আহ্বান
জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ঐতিহাসিক সাধারণ পরিষদ হলে বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। আর বিশ্ব কূটনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের সভাপতির আসনে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সময় সকালে শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্কে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান এই উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে সভাপতিত্ব করছেন। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচি অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা সাধারণ বিতর্কে সভাপতিত্ব করবেন তিনি।
উদ্বোধনী বক্তব্যে খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সামনে বর্তমান বিশ্বের আস্থা ও কার্যকারিতার সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের অস্তিত্ব আছে কি না—মানুষ এখন সেই প্রশ্ন করছে না; বরং তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্থাটি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে কি না। যুদ্ধ, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খলিলুর রহমানের জন্য এবারের সাধারণ পরিষদের মঞ্চটির সঙ্গে রয়েছে চার দশকের এক বিশেষ যোগসূত্র। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি স্মরণ করেন, ঠিক ৪০ বছর আগে এই একই সাধারণ পরিষদ হলে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর টিমের একজন নবীন সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। চার দশক পর এবার সেই একই হলে তিনি নিজেই সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসে বিশ্বনেতাদের অধিবেশন পরিচালনা করছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল গত ৮ সেপ্টেম্বর। ওই দিন সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে খলিলুর রহমান অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। আর ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত পর্ব—রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।
এবারের সাধারণ বিতর্কের প্রতিপাদ্য “Restoring trust, managing transformation: a United Nations that delivers for all”—অর্থাৎ আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ গড়ে তোলা।
উদ্বোধনী পর্বে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বক্তব্য দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ অধিবেশনে যোগ দেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
খলিলুর রহমান তার বক্তব্যে ফিলিস্তিন, গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের প্রসঙ্গ তোলেন। বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাতিসংঘের ভূমিকা এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের আকাঙ্ক্ষার কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তার নীতিগুলো বেছে বেছে প্রয়োগ করা হলে জাতিসংঘের প্রতি বিশ্বের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
জাতিসংঘ তার নবম দশকে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে খলিলুর রহমান বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি সংস্থাটির ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিশ্বের প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে অংশ নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো এবারের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এবারের অধিবেশনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ একদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে দেশের বক্তব্য তুলে ধরতে নিউইয়র্কে রয়েছেন, অন্যদিকে পুরো সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক পরিচালনার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশেরই ড. খলিলুর রহমান।

