প্রযুক্তির নতুন লড়াই হাসপাতাল-বিমা খাতে • রোগীর জটিলতা দেখানোর প্রবণতা বৃদ্ধির দাবি • চিকিৎসা না বাড়লেও বিলিং কোডে পরিবর্তন • সামনে ‘এআই বনাম এআই’ পরিস্থিতির আশঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্বাস্থ্যসেবাকে দ্রুত ও কার্যকর করার সম্ভাবনা তৈরি করলেও যুক্তরাষ্ট্রে এর ব্যবহার চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে—এমন দাবি করেছে দেশটির অন্যতম বড় স্বাস্থ্যবিমা সংগঠন ব্লু ক্রস ব্লু শিল্ড অ্যাসোসিয়েশন (BCBSA)।
সংস্থাটির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হাসপাতালগুলো বিমা দাবি বা ইনস্যুরেন্স ক্লেইম তৈরির ক্ষেত্রে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দুই বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৯৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্বাস্থ্য ব্যয় হয়েছে।
রোগীকে ‘জটিল’ দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে
BCBSA-এর বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নথিতে রোগীদের জটিল স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে সংস্থাটির বক্তব্য, রোগীর চিকিৎসা বা সেবার ধরনে একই মাত্রার পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ চিকিৎসা নথিতে রোগীর অবস্থাকে আগের তুলনায় বেশি জটিল হিসেবে কোড করা হলেও বাস্তবে তাকে দেওয়া চিকিৎসাসেবায় তার সমপরিমাণ পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়।
এই ব্যবধানই বিমা কোম্পানিগুলোর উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
হাসপাতাল ও বিমা প্রতিষ্ঠানের পুরোনো বিরোধে নতুন মাত্রা
কোন চিকিৎসার ব্যয় বিমা কোম্পানি বহন করবে, কত অর্থ পরিশোধ করা হবে এবং কোন দাবি অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করা হবে—এসব নিয়ে হাসপাতাল ও বিমা প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের।
তবে এখন উভয় পক্ষই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করায় সেই সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
হাসপাতালগুলো যেখানে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও বিমা দাবি তৈরিতে এআই ব্যবহার করছে, সেখানে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিপুলসংখ্যক দাবি যাচাই, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
ফলে ভবিষ্যতে একটি এআই সিস্টেমের তৈরি দাবি আরেকটি এআই সিস্টেম যাচাই বা চ্যালেঞ্জ করবে—এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
‘বটের সঙ্গে বটের লড়াইয়ের’ আশঙ্কা
স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছেন মেডিকেল এআই প্রতিষ্ঠান Abridge-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. শিব রাও।
তার মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার ভুল পথে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট ও বটগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করবে। তবে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে একই প্রযুক্তি হাসপাতাল ও বিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার বিরোধ কমানো এবং প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাসেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বিমা প্রতিষ্ঠান বলছে চাপ একপক্ষীয়
BCBSA-এর জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট লুক চালকার বর্তমান পরিস্থিতিকে দুই পক্ষের সমান লড়াই হিসেবে দেখছেন না। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, বর্তমান ব্যবস্থায় বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোই তুলনামূলকভাবে বেশি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে।
তবে হাসপাতালগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার জটিলতা এবং ব্যবহৃত সেবাগুলো যথাযথভাবে নথিভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এর ওপর বিমা পরিশোধের পরিমাণ অনেকাংশে নির্ভর করে।
এআই কি শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা সস্তা করবে, নাকি আরও ব্যয়বহুল?
স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের দ্রুত বিস্তার এখন নতুন একটি প্রশ্ন সামনে আনছে—প্রযুক্তিটি কি চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ কমিয়ে শেষ পর্যন্ত রোগীর চিকিৎসা ব্যয় কমাবে, নাকি আরও নিখুঁত ও বিস্তৃত বিলিংয়ের মাধ্যমে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়াবে?
BCBSA-এর দুই বছরের বিশ্লেষণে উঠে আসা ৯৪২ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
একদিকে এআই চিকিৎসকের নোট তৈরি, রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রশাসনিক কাজ দ্রুত করতে পারে। অন্যদিকে একই প্রযুক্তি যদি রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোডিং ও বিমা দাবির অর্থের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখে, তাহলে এর আর্থিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিমা প্রিমিয়াম, হাসপাতালের ব্যয় এবং রোগীর নিজের পকেটের খরচেও পড়তে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের পরবর্তী বড় পরীক্ষা তাই শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নয়—প্রযুক্তিটি চিকিৎসার মান বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, সেটিও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

