ইউএনজিএতে প্রথম ভাষণ • নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় বক্তব্য দেওয়ার কথা • জলবায়ু, বিশ্ব শান্তি, অর্থনীতি ও রোহিঙ্গা সংকট থাকবে গুরুত্বে • জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকট তাঁর ১৫ মিনিটের ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে।
একই সঙ্গে বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে চার দশকের বেশি সময়ের একটি পারিবারিক রাজনৈতিক ধারায় নতুন অধ্যায় যুক্ত করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
নিউইয়র্ক সময় বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাধারণ পরিষদ হলে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। বিকেলের অধিবেশনে নির্ধারিত ১৮ বক্তার মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ১১তম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন।
ভাষণে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, উন্নয়নের অগ্রাধিকার, বিশ্ব শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়গুলোও ভাষণে আসার কথা রয়েছে।
দারিদ্র্য বিমোচন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু কার্যক্রম ও জলবায়ু অর্থায়নের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
বাবা-মায়ের পর জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমান
তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তাঁর পরিবারের চার দশকের বেশি সময়ের জাতিসংঘ-সম্পৃক্ততার ইতিহাস।
তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন।
ওই ভাষণে জিয়াউর রহমান ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি।
এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তারেক রহমানের মা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন অধিবেশন ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে একাধিকবার বক্তব্য দেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ সভা এবং ২০০২ সালে শিশুদের বিষয়ে ২৭তম বিশেষ অধিবেশনও ছিল।
বাবা-মায়ের সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রথমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে উঠছেন তারেক রহমান।
বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ এবারের অধিবেশন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কারণেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
ফলে এমন সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন, যখন অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভাষণের আগে ব্যস্ত কর্মসূচি
সাধারণ পরিষদে ভাষণের আগে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বগত সংকট মোকাবিলাবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের সভার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিনের কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। সেখানে তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ারও কর্মসূচি রয়েছে।
এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।
‘ফ্রম কমিটমেন্ট টু অ্যাকশন: ইন্টিগ্রেটিং মিডওয়াইফ ইনটু প্রাইমারি হেলথ কেয়ার টু এন্ড প্রিভেন্টেবল মেটারনাল অ্যান্ড নিউবর্ন ডেথ’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানেও তাঁর যোগ দেওয়ার কথা।
দিনের কর্মসূচিতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।
সাধারণ পরিষদে ভাষণ শেষে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির আয়োজনে তাঁর সম্মানে দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর।
নিউইয়র্কে টানা কূটনৈতিক তৎপরতা
৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর থেকেই বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন তারেক রহমান।
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত প্রতিনিধি দলের প্রধান ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে প্রাতঃরাশ সভায় যোগ দেন তিনি। পরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী পর্বে অংশ নেন।
সফরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফ, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এমের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে।
এ ছাড়া মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক জনহিতকর ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি আলোচনায় অংশ নেন তিনি। ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায়সংগত রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায়ও অংশ নেন।
নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে ম্যানহাটনে জেপি মরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি প্রাতরাশ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
একই দিনে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচিও রয়েছে।
তবে নিউইয়র্ক সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় কর্মসূচি হিসেবে নজর থাকবে আজকের সাধারণ পরিষদের ভাষণে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্ব সংস্থার সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বশীল মঞ্চে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ।

