অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসলামী বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে: এরদোয়ান

তুরস্ক–সৌদি আরব–পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোয় ‘এক দেশের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা’ নীতি; যৌথ মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ শুধু তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন অধ্যায় নয়, বরং এর মাধ্যমে বৃহত্তর ইসলামী বিশ্বের প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

সোমবার তুরস্কের উত্তরাঞ্চলীয় সামসুন প্রদেশে তরুণদের সঙ্গে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। এরদোয়ান বলেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে ইসলামী বিশ্বের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। চুক্তিকে ঘিরে ইতিবাচক অগ্রগতিও হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এরদোয়ান বলেন, ইসলামী বিশ্বের সামনে থাকা সংকট ও চ্যালেঞ্জ দ্রুত কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে তুরস্ক আঞ্চলিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কী আছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চুক্তিটির মূল লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা এবং তিন দেশের নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। তুরস্কের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের ভিত্তিতেই চুক্তির কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

চুক্তির আওতায় তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করে কৌশলগত রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়া, বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও মানববিহীন ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যৌথভাবে সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়ন ও উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক সহযোগিতায়। মানববিহীন ও স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও সহযোগিতার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

স্থায়ী সচিবালয় গঠনের সিদ্ধান্ত

চুক্তিকে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও নিয়েছে তিন দেশ। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা এর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও নীতিগত সমন্বয়ের জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইসলামী বিশ্বের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান—তিন দেশই মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তি। সৌদি আরবের উপসাগরীয় ও আরব বিশ্বে প্রভাব, তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা—এই তিন উপাদানের সমন্বয় নতুন চুক্তিটিকে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে।

তবে চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক জোট গড়ে তোলা নয়। এরদোয়ান এর আগেও বলেছেন, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয় এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় আগ্রহী ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

১২ আগস্ট দেওয়া আরেক বক্তব্যে এরদোয়ান মক্কা চুক্তিকে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের পক্ষে তুরস্কের অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ভবিষ্যতে এর অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।

উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ

চুক্তিটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোটির বাস্তব ভূমিকা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।

সম্প্রতি হুতি হামলার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান জানিয়েছে, মক্কা চুক্তির অধীনে কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক জবাব নিয়ে আলোচনা হয়নি। অর্থাৎ চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বিধান থাকলেও প্রতিটি সংকটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো দৃশ্যমান নয়।

ফলে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির তাৎপর্য শুধু সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমন্বয় গড়ে তোলার একটি নতুন কাঠামো হিসেবেও সামনে এসেছে। আর এরদোয়ানের সর্বশেষ বক্তব্য স্পষ্ট করছে—আঙ্কারা এই উদ্যোগকে তিন দেশের দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে বৃহত্তর ইসলামী বিশ্বের জন্যও একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন