অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শি-মোদি বৈঠকের মধ্যেই সীমান্তে চীনের নতুন স্থাপনা, স্যাটেলাইট চিত্রে দাবি

অরুণাচল সীমান্তের কাছে ভবন, সড়ক ও হেলিপ্যাড নির্মাণের চিত্র; স্থানীয়দের দাবি, পৈতৃক চারণভূমি থেকে পিছু হটতে হচ্ছে

নয়াদিল্লিতে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সীমান্তে শান্তি বজায় রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন, ঠিক তখনই বিতর্কিত অরুণাচল সীমান্তের কাছে চীনের নতুন অবকাঠামো নির্মাণের তথ্য সামনে এসেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন ভবন, সড়ক ও হেলিপ্যাডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।

সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও সংবাদমাধ্যমটির কাছে অভিযোগ করেছেন, চীনা বাহিনীর তৎপরতা বাড়তে থাকায় তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি ও শিকারের এলাকা থেকে ক্রমেই পিছু হটছেন। তবে এসব এলাকায় চীনা সেনারা ঠিক কতটা ভারত-দাবিকৃত ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট চিত্র, ওপেন সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সীমান্ত পরিস্থিতির এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বিতর্কিত সীমান্তে নতুন নির্মাণ

অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি এলাকার কাছাকাছি চীন-নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামোগত তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান জেনসের বিশ্লেষকদের মতে, তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির ঝারি এলাকার আশপাশে অন্তত দুটি স্থানে উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন ভবন, সড়ক সম্প্রসারণ এবং হেলিপ্যাড তৈরির চিহ্ন পাওয়া গেছে। সীমান্ত নিয়ে ভারত ও চীনের নিজ নিজ দাবির রেখা বিবেচনায় নিলে কয়েকটি স্থাপনা উভয় দেশের দাবি করা বিতর্কিত এলাকার মধ্যে পড়ছে বলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন।

ঝারি এলাকার দক্ষিণে একটি স্থানে ২০১৯ সাল থেকে নির্মাণকাজের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। সেখানে ভূমি সমতল করা, প্রকৌশলযানের উপস্থিতি এবং নির্মাণসংশ্লিষ্ট স্থাপনা শনাক্ত হয়েছে।

আরেকটি স্থানে ভবনের ধরন, আশপাশের অবকাঠামো ও যানবাহনের উপস্থিতি দেখে সেটির সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলেছেন বিশ্লেষকেরা। তবে শুধু স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে স্থাপনাগুলোর উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

বড় হেলিপ্যাড, নতুন সড়ক

স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণে লহুনজের দক্ষিণে আগে থাকা দুটি ছোট হেলিপ্যাডের জায়গায় তুলনামূলক বড় একটি হেলিপ্যাড নির্মাণ এবং আরও দক্ষিণে আরেকটি নতুন হেলিপ্যাড তৈরির তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ওই এলাকার সঙ্গে সংযোগকারী একটি নতুন সড়কও তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগস্টের স্যাটেলাইট চিত্রে অন্তত একটি ভবনের ছাদ নির্মাণ শেষ হওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা ওই এলাকায় নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।

সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের উদ্বেগ

অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী গেলেমো গ্রামের বাসিন্দা তাকোক ম্রা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেছেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী যে ভূমি দীর্ঘদিন ধরে চারণ, শিকার ও জীবিকার কাজে ব্যবহার করে আসছে, তার কিছু অংশে এখন তারা আগের মতো যেতে পারছেন না।

চীনা বাহিনী ভারত-দাবিকৃত এলাকার ভেতরে প্রবেশ করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে কতটা এলাকা এর আওতায় পড়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিমাপ দিতে পারেননি।

অরুণাচলের তাগিন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের একটি দলও আগস্টে গেলেমো ও তাকসিং এলাকা পরিদর্শন করে। দলটি স্থানীয় বাসিন্দা ও সেনাবাহিনীর রসদ পরিবহনে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে।

সংগঠনটির সভাপতি তাদাক পাকবার দাবি, আগে ভারতীয় বাহিনী যেসব এলাকায় নিয়মিত টহল দিত, সেসবের কয়েকটিতে এখন চীনা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

তাদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে স্থানীয় প্রশাসন ও অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এতে তাকসিং-গেলেমো সীমান্ত এলাকায় পিপলস লিবারেশন আর্মির কথিত তৎপরতা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

দিল্লিতে তখন শান্তির বার্তা

সীমান্ত নিয়ে এসব অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন সাত বছর পর ভারত সফরে গিয়ে শি জিনপিং নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন।

ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শনিবারের ওই বৈঠকে মোদি বলেন, দুই দেশের মতপার্থক্য যেন বিরোধে পরিণত না হয়। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ভারত-চীন সম্পর্কের অগ্রগতির অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

দুই নেতা সীমান্ত সমস্যার একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্ক তীব্রভাবে অবনতি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কয়েকটি সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সেনা সরানো হলেও দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্তের বিরোধ এখনো পুরোপুরি মেটেনি।

ফলে একদিকে দিল্লিতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা, অন্যদিকে অরুণাচল সীমান্তের কাছে নতুন অবকাঠামো ও স্থানীয়দের অনুপ্রবেশের অভিযোগ—দুই প্রতিবেশী শক্তির সম্পর্কের পুরোনো সীমান্ত সংকটকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন