অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক দশকের মধ্যেই এআই মানবজাতির জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি? বাড়ছে সতর্কবার্তা

সুপারইন্টেলিজেন্স নিয়ন্ত্রণে আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তির দাবি; তবে ‘কেয়ামতের আশঙ্কা’ বাদ দিয়ে বর্তমান ক্ষতির দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শও বিশেষজ্ঞদের

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ এবার প্রযুক্তিবিদদের একাংশের মধ্যে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়েই গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম সম্ভাব্য ‘আর্টিফিশিয়াল সুপারইন্টেলিজেন্স’ (এএসআই) নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এর পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন কয়েকজন শীর্ষ গবেষক ও রাজনীতিক।

কেউ কেউ আগামী এক দশকের মধ্যে উন্নত এআইয়ের কারণে মানবজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ার ঝুঁকিও উল্লেখ করছেন। তবে এ ধরনের আশঙ্কা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে মতভেদ রয়েছে। একদল কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরিই বন্ধ করার পক্ষে, অন্যরা বলছেন—ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘এআই মহাবিপর্যয়’ নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা করলে চাকরি হারানো, ভুল তথ্য, সাইবার ঝুঁকি ও পরিবেশগত ক্ষতির মতো বর্তমান সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এআইয়ের ঝুঁকি ঘিরে প্রযুক্তিবিদ, এআই প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও রাজনীতিকদের এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।

‘নিয়ন্ত্রণ হারানোর’ আশঙ্কা

কম্পিউটার বিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টুয়ার্ট রাসেল দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ন্ত্রিত উন্নত এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। তাঁর আশঙ্কা, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া শক্তিশালী এআই তৈরি হতে থাকলে একপর্যায়ে মানুষের পক্ষে এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেস ব্রাউনসহ আরও কয়েকজন নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ সম্ভাব্য সুপারইন্টেলিজেন্সকে অত্যন্ত গুরুতর বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যে সুপারইন্টেলিজেন্সের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার দাবিও জোরালো হচ্ছে। দেশটির ৭০ জনের বেশি এমপি ও পিয়ার এএসআই তৈরির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এআই প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেও সতর্কবার্তা

উদ্বেগ আরও বেড়েছে শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের বক্তব্যে।

অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেওয়ার পর অভিযোগ করেন, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তার প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। অ্যানথ্রোপিকের বর্তমান কয়েকজন গবেষকও তাঁর উদ্বেগের সঙ্গে প্রকাশ্যে একমত হয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির অ্যালাইনমেন্ট গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ইভান হাবিঙ্গার আগামী এক দশকে অত্যন্ত উন্নত এআইয়ের কারণে মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি ১০ শতাংশের বেশি বলে নিজের মূল্যায়ন জানিয়েছেন।

অ্যানথ্রোপিক অবশ্য বলছে, এআই নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং মডেলের আচরণ বোঝার গবেষণায় তারা উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দিচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিকদের চাপ

এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তাল মেলাতে পারছে কি না—এ প্রশ্নও এখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ একাধিক আইনপ্রণেতা উন্নত এআই তৈরিতে কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড ও সরকারি নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যেও এএসআই নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির আহ্বান উঠেছে।

গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, এআই কোম্পানিগুলোর ভেতর থেকে আসা সতর্কবার্তার পর আটলান্টিকের দুই পাশেই নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের দাবি জোরালো হয়েছে।

বাস্তব ঝুঁকির নজিরও সামনে

উদ্বেগ কেবল ভবিষ্যতের সুপারইন্টেলিজেন্সে সীমাবদ্ধ নেই। অ্যানথ্রোপিক সম্প্রতি তাদের এআই ব্যবহারের অপব্যবহার নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাইবার হামলা, নজরদারি এবং জৈব গবেষণাসহ বেশ কিছু উদ্বেগজনক ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মডেল ব্যবহার করে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চালানোর কিছু প্রচেষ্টা শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে। ফলে শক্তিশালী এআইয়ের অপব্যবহার কীভাবে বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।

‘টার্মিনেটর’ নয়, বর্তমান সমস্যায় নজর দেওয়ার তাগিদ

তবে এআই নিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পূর্বাভাসগুলোর সঙ্গে সব গবেষক একমত নন।

তাঁদের একটি অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে সর্বশক্তিমান এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে—এমন কল্পনানির্ভর দৃশ্যপটকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখলে ইতোমধ্যে দেখা দেওয়া বাস্তব সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

তাঁরা এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে পরিবর্তন, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার, সাইবার নিরাপত্তা, বৈষম্য এবং বিপুল বিদ্যুৎ ও পানিনির্ভর ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাবের মতো সমস্যায় দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।

ফলে বিতর্কটি এখন আর এআই ‘ভালো না খারাপ’—এই সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং সবচেয়ে শক্তিশালী এআই কে তৈরি করবে, কত দ্রুত তৈরি করা হবে, তার ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কত দূর এগোনোর অনুমতি দেওয়া উচিত—এসব প্রশ্নই ক্রমে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে চলে আসছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন