অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘ভারত-মোহ’ কাটাতে চায় বাংলাদেশ, দিল্লির গণমাধ্যমে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা

সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চায় ঢাকা • পারস্পরিক স্বার্থই হবে ভিত্তি • বহুপক্ষীয় মঞ্চ নয়, সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় জোর • ১০১ সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার বিষয়ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত নির্ভরতা বা ‘মোহ’ থেকে বেরিয়ে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়তে চায় বাংলাদেশ- পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের এমন বক্তব্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম The Indian Express সোমবার হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একই বিষয়ে Hindustan Times, Financial Express, New Indian Express, Indian Express Bangla এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম Akashvani Newsও সংবাদ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নতুন দিল্লি-নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং দুই দেশের সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায়; তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে দুই সার্বভৌম দেশের পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে। তাঁর মতে, ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির প্রক্রিয়াটি বহুপক্ষীয় কোনো সম্মেলনের সাইডলাইনে নয়, বরং সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া উচিত।

‘সকাল-দুপুর-রাত শুধু ভারত হলে নিজের খাবার খাবেন কখন?’

ভারতকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের অতিরিক্ত মনোযোগ বোঝাতে হুমায়ুন কবির একটি উপমা ব্যবহার করেন, যা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামেও উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা সকাল, দুপুর ও রাত সব সময়ই যদি ভারতকে কেন্দ্র করে আলোচনা চলে, তাহলে বাংলাদেশের নিজের অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?

তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশকে এই ‘India fascination’ বা ভারতকেন্দ্রিক অতিরিক্ত মোহ থেকে বের হতে হবে। ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং ঢাকা তার সঙ্গে ভালো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চায়; কিন্তু সেই সম্পর্ককে বাংলাদেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

The Indian Express এই বক্তব্যকে সামনে এনে তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে ‘‘Fascination with India must end’: Bangladesh minister sparks row”। অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন মন্ত্রীর ‘ভারত-মোহ’ কাটানোর আহ্বানকে পত্রিকাটি সরাসরি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

‘রিসেট’ করতে চায় ঢাকা

Hindustan Times বাংলাদেশের অবস্থানকে তুলে ধরেছে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার উদ্যোগ হিসেবে। পত্রিকাটি জানিয়েছে, হুমায়ুন কবির আগের ১৫ বছরের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘অস্বস্তিকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এখন পারস্পরিক স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন সম্পর্ক তৈরির কথা বলেছেন।

ভারতের Financial Express আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, বাংলাদেশের ‘India fascination’ থেকে বের হওয়ার আহ্বানের পর দুই দেশ সত্যিই কি সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে পারবে? তাদের বিশ্লেষণে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম Akashvani Newsও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় ফোরামের পরিবর্তে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। সীমান্তের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও আন্তর্জাতিক আইন, বিদ্যমান সীমান্ত প্রটোকল ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুসরণ করে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চায় ঢাকা।

পটভূমিতে ব্রিকস

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ভারতের আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করা নিয়েও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আলোচনায় এসেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম ভারত সফর একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। ঢাকা চায়, প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফরটি যথাযথ দ্বিপক্ষীয় কাঠামোয় অনুষ্ঠিত হোক।

এই প্রেক্ষাপটেই হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়তে হলে সেটি সরাসরি দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া প্রয়োজন।

আলোচনায় ১০১ সমঝোতা স্মারক

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে- ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত ১০১টি সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা।

Hindustan Times জানিয়েছে, ক্ষমতাসীন বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার কথা বলেছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হুমায়ুন কবির জানান, সমঝোতাগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ফলে ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোচনাটি শুধু হুমায়ুন কবিরের একটি মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামগ্রিক ভারতনীতি কোন দিকে যাচ্ছে- সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

সম্পর্কের সামনে পানি, সীমান্ত ও হাসিনা ইস্যু

দুই দেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়ও রয়েছে। Financial Express বিশেষভাবে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির কথা উল্লেখ করেছে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। পাশাপাশি তিস্তার পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধকেও সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হিসেবে তুলে ধরেছে।

দিল্লিকে গুরুত্ব, তবে ‘বিশেষ মোহ’ নয়

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যের মূল সুর অবশ্য ভারতবিরোধী সম্পর্ক তৈরির নয়। বরং তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর ও ভালো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চায়- কিন্তু সেটি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর।

এই অবস্থানই এখন ভারতের সংবাদমাধ্যমে বিশেষ মনোযোগ পাচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হিসেবে দেখা হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের কাঠামো ও অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারিত হচ্ছে।

Indian Express থেকে Hindustan Times, Financial Express এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় Akashvani—একাধিক মাধ্যমে একই বক্তব্যের ব্যাপক কাভারেজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের নতুন ভারতনীতি দিল্লির রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের নজরে রয়েছে।

এখন বড় প্রশ্ন—‘ভারত-মোহ’ থেকে বেরিয়ে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার যে বার্তা ঢাকা দিচ্ছে, দিল্লি তার জবাব কীভাবে দেয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন