অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন মাসে ‘কোটিপতি’ হিসাব বেড়েছে ৫,০৭৭টি, জমা আরও সাড়ে ১৬ হাজার কোটি, বাংলাদেশ ব‍্যাংক

জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি • এসব হিসাবে জমা ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা • ব্যক্তি পর্যায়ে বেড়েছে মাত্র ৭১টি হিসাব • ব্যক্তির আমানত উল্টো কমেছে ১,২২১ কোটি টাকা • সম্পদ বৈষম্যের প্রশ্নও সামনে

বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকা: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের মধ্যেই দেশের ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা মাত্র তিন মাসে বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। চলতি বছরের মার্চ শেষে এ ধরনের হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে।

শুধু হিসাবের সংখ্যাই নয়, বেড়েছে এসব হিসাবে জমা অর্থও। মার্চ শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে মোট ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা ছিল। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে এই শ্রেণির হিসাবে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।

তবে এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি দেশে নতুন করে ৫ হাজার ৭৭ জন ব্যক্তি কোটিপতি হয়েছেন—এভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। কারণ কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাবগুলোর মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও কোম্পানি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব রয়েছে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক হিসাবও থাকতে পারে।

ব্যক্তি ‘কোটিপতি’ বেড়েছে মাত্র ৭১ হিসাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত বিশ্লেষণে আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার হিসাব ৫ হাজার ৭৭টি বাড়লেও ব্যক্তি শ্রেণির কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব বেড়েছে মাত্র ৭১টি।

মার্চ শেষে ব্যক্তি শ্রেণিতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৪০ হাজার ৬৩০টি। জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টিতে।

আরও লক্ষণীয় হলো—হিসাবের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও এই ব্যক্তিদের হিসাবে মোট জমা অর্থ কমেছে।

মার্চ শেষে ব্যক্তি শ্রেণির এসব হিসাবে ছিল ৯১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা কমে ৯০ হাজার ১৩১ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ের কোটি টাকার হিসাবে আমানত ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা কমেছে।

এই উপাত্ত থেকে স্পষ্ট হয়, ৫ হাজার ৭৭টি নতুন কোটি টাকার হিসাবের বৃদ্ধিকে শুধু ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির গল্প হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্রটি ধরা পড়বে না। বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব থেকে।

তাহলে টাকা বাড়ছে কোথায়?

ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ব্যক্তি হিসাবের তুলনায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাবের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যাংকারদের একটি হিসাবে, কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যক্তি শ্রেণির, আর বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক।

নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে অনিশ্চয়তা থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান হাতে থাকা অর্থ তাৎক্ষণিক বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে জমা রাখতে পারে। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে সঞ্চয়ের সক্ষমতা না বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বৃদ্ধির কারণে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা ও মোট আমানত দুটোই বাড়তে পারে।

তিন মাসে ব্যাংকে এসেছে আরও ৫২ হাজার কোটি টাকা

শুধু কোটি টাকার হিসাব নয়, দেশের পুরো ব্যাংক খাতেই মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত আমানত বেড়েছে।

মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাব ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি।

অর্থাৎ তিন মাসে নতুন ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৩টি।

একই সময়ে মোট ব্যাংক আমানত প্রায় ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বেড়েছে। জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

প্রতি ১০০ টাকার বড় অংশই অল্পসংখ্যক বড় হিসাবে

ব্যাংক আমানতের বণ্টনের আরেকটি চিত্র সম্পদ কেন্দ্রীভবনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। মার্চের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথম আলো জানিয়েছিল, ব্যাংকে জমা প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৪০ টাকা ছিল কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবে। অথচ কোটি টাকার হিসাব মোট ব্যাংক হিসাবের ১ শতাংশেরও কম।

জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাবগুলোতে থাকা ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা মোট ব্যাংক আমানতেরও একটি বড় অংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধিকে সরাসরি কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয় এবং কোটি টাকার ব্যক্তিগত হিসাব বৃদ্ধির সঙ্গে আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বছর বছর বাড়ছে কোটি টাকার হিসাব

দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের দ্রুত বৃদ্ধির চিত্র দেখা যায়।

২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ধরনের হিসাব ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি। ২০২১ সালে তা ১ লাখ ছাড়িয়ে ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬টি হয়। ২০২২ সালে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০২৩ সালের শেষে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে পৌঁছায়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। আর চলতি বছরের জুন শেষে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে।

অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বেড়েছে প্রায় ৪৭ হাজার ৭০০টি।

ধনী মানুষের প্রকৃত সম্পদ আরও বেশি হতে পারে

ব্যাংকের এই পরিসংখ্যান আবার দেশের সম্পদশালী জনগোষ্ঠীর পুরো সম্পদের চিত্রও দেয় না। কারণ অনেক উচ্চসম্পদশালী ব্যক্তি ব্যাংকে নগদ অর্থ রাখার পরিবর্তে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, ব্যবসা, শেয়ারসহ বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগ করেন।

ব্যাংকারদের মতে, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত উদ্বেগ, ব্যাংকিং খাত নিয়ে আস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেও অনেকে বড় অঙ্কের অর্থ একটি ব্যাংক হিসাবে রাখতে চান না। কেউ কেউ অর্থ একাধিক ব্যাংক হিসাবে ভাগ করে রাখেন।

এই বাস্তবতায় কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের পরিসংখ্যান দেশের সম্পদ বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও সেটিই বাংলাদেশের কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা নয়।

সংখ্যায় তিন মাসের পরিবর্তন

কোটি টাকার বেশি হিসাব:
১,৩৬,৪৮৫ → ১,৪১,৫৬২
বৃদ্ধি: ৫,০৭৭টি

কোটি টাকার হিসাবে আমানত:
৮,৫৯,১৬২ কোটি → ৮,৭৫,৬৬০ কোটি টাকা
বৃদ্ধি: ১৬,৪৯৮ কোটি টাকা

ব্যক্তি শ্রেণির কোটি টাকার হিসাব:
৪০,৬৩০ → ৪০,৭০১টি
বৃদ্ধি: মাত্র ৭১টি

ব্যক্তি শ্রেণির আমানত:
৯১,৩৫২ কোটি → ৯০,১৩১ কোটি টাকা
কমেছে: ১,২২১ কোটি টাকা

ব্যাংক খাতে মোট আমানত:
২১,৫৮,০২৫ কোটি টাকার কাছাকাছি → ২২,১০,৪৪৪ কোটি টাকা
বৃদ্ধি: প্রায় ৫২,৪১৯ কোটি টাকা

সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো- তিন মাসে ‘কোটিপতি’ ব্যক্তি ৫ হাজার ৭৭ জন বাড়েননি; বরং কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। ব্যক্তি শ্রেণির ক্ষেত্রে বৃদ্ধি মাত্র ৭১টি। তাই এই উপাত্তের বড় গল্প শুধু ‘কোটিপতি বৃদ্ধি’ নয়; বরং দেশের ব্যাংক আমানত কার হাতে এবং কোন ধরনের হিসাবে ক্রমে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে—সেটিই বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন