রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ২ কোটি ৭২ লাখ হিসাব, ঋণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ

৮৫ শতাংশ হিসাব গ্রামে • প্রায় অর্ধেক হিসাব নারীদের • আমানত ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা • ঋণ ছাড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৭০ কোটি • ঋণের ৬৪ শতাংশ গেছে গ্রামে, নারীদের অংশ মাত্র ১২.৭২ শতাংশ

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। ২০২৬ সালের জুন শেষে এ ব্যবস্থায় গ্রাহক হিসাবের সংখ্যা বেড়ে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এর ৮৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকদের। একই সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন, এপ্রিল-জুন ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ২৫৬টিতে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় হিসাব বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

এ সময়ে দেশের ৩০টি ব্যাংক ১৫ হাজার ৪২৪ জন এজেন্টের অধীনে ২০ হাজার ৫৯৭টি আউটলেটের মাধ্যমে সেবা দিয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে এজেন্ট বেড়েছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং আউটলেট বেড়েছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ।

গ্রামেই ৮৫ শতাংশ হিসাব

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। জুন শেষে মোট হিসাবের মধ্যে ২ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৫টি ছিল গ্রামের গ্রাহকদের। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি হিসাবের প্রায় ৮৫টিই গ্রামীণ এলাকায়।

নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। মোট হিসাবের মধ্যে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৮টি নারীদের নামে, যা মোট হিসাবের প্রায় অর্ধেক।

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নারী গ্রাহকদের হিসাব ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এ বৃদ্ধির হার পুরুষ গ্রাহকদের তুলনায় বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে হিসাবের ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়েছে।

আমানত প্রায় ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা

হিসাবের পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতও বাড়ছে। জুন শেষে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৯ হাজার ৭২ দশমিক ৯২ মিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশি মুদ্রার প্রচলিত হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।

মার্চের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, এজেন্ট আউটলেট এখন শুধু নগদ অর্থ জমা-উত্তোলন বা রেমিট্যান্স গ্রহণের কেন্দ্র হিসেবে নয়, আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেলে পরিণত হচ্ছে।

ঋণে বড় উল্লম্ফন, এক বছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪১ শতাংশ

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ঋণ বিতরণে। জুন শেষে এ চ্যানেলের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৭০৩ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ৪০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা।

মাত্র তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। আর এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৩টি বর্তমানে এ চ্যানেলের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করছে।

ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে ঋণ-আমানত অনুপাতও দ্রুত বাড়ছে। মার্চ শেষে এ অনুপাত ছিল ৭৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৭৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে।

ঋণের ৬৪ শতাংশ গ্রামে

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের বড় অংশই গেছে গ্রামীণ এলাকায়। জুন পর্যন্ত গ্রামের গ্রাহকেরা পেয়েছেন ২ লাখ ৬২ হাজার ২৬৩ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন টাকা। এটি মোট ঋণের ৬৪ দশমিক ১৭ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান গ্রামীণ অর্থনীতিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে প্রচলিত ব্যাংক শাখার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ গ্রাহকদের কাছে ঋণ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ছে।

অর্ধেক হিসাব নারীর, কিন্তু ঋণের মাত্র ১২.৭২ শতাংশ

হিসাব খোলার ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ৫০ শতাংশ হলেও ঋণপ্রাপ্তিতে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

জুন পর্যন্ত নারী গ্রাহকদের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ২ দশমিক ০৬ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এটি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ।

ফলে হিসাবের মালিকানায় নারী-পুরুষের ব্যবধান অনেকটাই কমে এলেও ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীরা এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। এ খাতে নারী গ্রাহক ও উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) এবং নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ বাড়াতে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম কার্যকরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রেমিট্যান্স পৌঁছাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে

রেমিট্যান্স বিতরণেও এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। জুন শেষে এজেন্টদের মাধ্যমে বিতরণ করা সংশ্লিষ্ট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৪৯ দশমিক ০৪১ মিলিয়ন টাকা।

আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। আর এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট রেমিট্যান্সের ৯০ দশমিক ৪৪ শতাংশই পেয়েছেন গ্রামীণ এলাকার সুবিধাভোগীরা। ফলে বড় শহরের বাইরে প্রবাসী আয় দ্রুত ও সহজে পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা স্পষ্ট।

এজেন্ট উদ্যোক্তা হিসেবেও বাড়ছে নারীর উপস্থিতি

শুধু গ্রাহক নয়, এজেন্ট ব্যাংকিং উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। জুন পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক ১ হাজার ৭৭৬ জন নারী উদ্যোক্তার মালিকানাধীন ২ হাজার ১০৬টি আউটলেটের মাধ্যমে সেবা দিয়েছে।

নারীদের মালিকানাধীন এসব আউটলেট দেশের মোট এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের ১০ দশমিক ২২ শতাংশ।

এসব আউটলেটের অধীনে প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজারই গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকদের।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বড় মাধ্যম

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত ব্যাংক শাখা স্থাপন কঠিন বা ব্যয়বহুল—এমন অঞ্চল এবং ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া।

বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে গ্রাহকেরা আমানত রাখা ও উত্তোলন, ঋণ গ্রহণ, রেমিট্যান্স গ্রহণ, বিভিন্ন বিল পরিশোধ এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ গ্রহণসহ বিভিন্ন সেবা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে গ্রামীণ এলাকায় হিসাব ও ঋণের উচ্চ অংশ, রেমিট্যান্স বিতরণে গ্রামের আধিপত্য এবং নারী গ্রাহকের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি—সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব আরও বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক হিসাব নারীদের হলেও মোট ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ তাদের কাছে যাওয়ার তথ্যটি এ খাতে বিদ্যমান একটি বড় ব্যবধানও সামনে এনেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন