রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাকে ‘বাংলার স্যার সৈয়দ’ বলা যেতে পারে: ঢাবি উপাচার্য

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কাছে অশেষ ঋণে আবদ্ধ’; শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে আহ্ছানউল্লার অবদান নিয়ে ঢাবিতে সেমিনার

শিক্ষা বিস্তার, মুসলিম সমাজের সংস্কার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার ভূমিকা তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, তাঁর কর্ম ও অবদান বিবেচনায় তাঁকে ‘বাংলার স্যার সৈয়দ’ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘হযরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র.)-এর শিক্ষা ও অধ্যাত্মচেতনার সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ইনস্টিটিউট যৌথভাবে সেমিনারের আয়োজন করে।

উপাচার্য বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙালি মুসলমানের জাগরণের সময় খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা একজন ‘রেনেসাঁপুরুষ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আহ্ছানউল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কাছে অশেষ ঋণে আবদ্ধ।’

স্যার সৈয়দের সঙ্গে আহ্ছানউল্লার ভূমিকার তুলনা

উপাচার্য তাঁর বক্তব্যে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের উদ্যোগের সঙ্গে ভারতীয় মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রপথিক স্যার সৈয়দ আহমদ খানের ভূমিকার তুলনা করেন।

তিনি বলেন, বৃহত্তর বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আধুনিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আহ্ছানউল্লার ভূমিকার সঙ্গে স্যার সৈয়দের কাজের মিল রয়েছে। উভয়েই ব্রিটিশ ভারতের পিছিয়ে থাকা মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার ঘাটতিকে মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছিলেন দুই মনীষী। এ কারণে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে তাঁরা কাজ করেন।

তিনি বলেন, স্যার সৈয়দ আহমদ খান উত্তর ভারতে মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খসড়া বিলের স্পেশাল কমিটির সদস্য হিসেবে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারীদের যুক্তি খণ্ডন করেন।

‘সমাজ সংস্কারে শতাধিক গ্রন্থ’

সমাজ সংস্কারে দুই মনীষীর ভূমিকার তুলনা করে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সমাজের কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে ‘তাহযীব-আল-আখলাক’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাও সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন এবং ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিতে ব্রিটিশ সরকার সৈয়দ আহমদ খানকে ‘স্যার’ এবং আহ্ছানউল্লাকে ‘খানবাহাদুর’ উপাধি দেয় উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, এসব দিক বিবেচনায় আহ্ছানউল্লাকে ‘বাংলার স্যার সৈয়দ’ বলা যেতে পারে।

আহ্ছানউল্লার শিক্ষা ও অধ্যাত্মদর্শনের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপাচার্য বলেন, তাঁর আদর্শ ও দর্শন নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তাঁর জীবন ও দর্শন ভবিষ্যতেও মানুষের চলার পথে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষা ও অধ্যাত্মচেতনা নিয়ে আলোচনা

ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদের সভাপতিত্বে সেমিনারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. একরাম হোসেন প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

মুখ্য আলোচক ছিলেন নর্থ আমেরিকান মুসলিম এলায়েন্সের প্রেসিডেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যামফোর্ডের রাহমাতুল্লিল আলামীন জামে মসজিদের খতিব শাইখ মুহাম্মদ সাইফুল আজম আজহারী।

বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার, নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি এইচএম মাহফুজুল হক, ইউনাইটেড গ্রুপের উপদেষ্টা আলহাজ আতাউর মাহমুদ রানা এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান।

আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসানুল হাদী এবং খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এমএফএম এনামুল হক।

নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ ডা. মো. নজরুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুস সবুর খান।

আহ্ছানউল্লাকে নিয়ে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার রচিত ‘খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার চিন্তন ও রচনায় ফারসি ভাব-দর্শনের প্রভাব’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন