রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ পাবেন ৫ হাজার জন

মেডিকেল কলেজে ৫০ ও জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার; নার্স-টেকনোলজিস্টের ৫ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:

কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে ছড়িয়ে দিতে দেশব্যাপী ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে। জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পর পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায়েও এ সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বিশাল কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল প্রস্তুত করতে নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মিলিয়ে পাঁচ হাজার জনকে তিন মাসের বিশেষায়িত ডায়ালাইসিস প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট—দুই ক্যাটাগরিতে আড়াই হাজার করে মোট পাঁচ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ১২০ জনকে নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনে ৯০ জন, পাবনায় ২০ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। শিগগিরই সিলেটসহ আরও কয়েকটি স্থানে বড় পরিসরে প্রশিক্ষণ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, সারা দেশে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সুবিধা নিশ্চিত করতে নতুন নার্স নিয়োগের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

প্রশিক্ষণ চলবে তিন মাস

২০২৬-২৭ অর্থবছরের আওতায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন নেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর সরকারি চাকরির মেয়াদ কমপক্ষে দুই বছর এবং বয়স সর্বোচ্চ ৪০ বছর হতে হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আড়াই হাজার নার্সসহ মোট পাঁচ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতি ব্যাচে ৫০ থেকে ১০০ জন প্রশিক্ষণার্থী থাকবেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) এবং ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে সিদ্ধান্ত

গত ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক বৈঠকে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণসহ স্বাস্থ্য খাতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সমন্বয় সেলের উদ্যোগে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে বৈঠকের কার্যবিবরণী পাঠানো হয়।

এর আগে ২০ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

ঢাকার বাইরে ডায়ালাইসিস সুবিধা অপ্রতুল

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসনির্ভর হয়ে পড়েন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৪৬টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। এর আনুমানিক ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ঢাকায়। ফলে রাজধানীর বাইরে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের জন্য নিয়মিত ডায়ালাইসিস সেবা পাওয়া এখনো কঠিন।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের ডায়ালাইসিস কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালু হওয়ার তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে এ সুবিধা স্থাপনের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরির সিদ্ধান্ত রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত

১২ আগস্টের বৈঠকে তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট কমাতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রবেশনারি চিকিৎসকদের নিজ নিজ উপজেলায় পদায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো উপজেলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাওয়া না গেলে পাশের উপজেলা বা জেলা থেকে চিকিৎসক পদায়নের ব্যবস্থা করা হবে।

এ ছাড়া আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও কনসালট্যান্টদের স্বয়ংক্রিয় পদায়ন নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে এক মাসের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত রয়েছে।

ঢাকার মিরপুরে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিবর্তে সেখানে ৬০০ শয্যার একটি জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পর্যায়ক্রমে জেলা এবং পরে উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য কিডনি রোগীদের রাজধানী বা বড় শহরের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ তৈরি হতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন