মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু, একদিনে ৯ মৃত্যু

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্তের পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪২ হাজার ১২৭ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩ হাজার ২১৮ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩০ জনে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এবার দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-২ ও ডেন-৩ সেরোটাইপের প্রভাব একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। শিশু ও কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ

ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও চলায় সারাদেশে জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। ফলে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালসহ বড় হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগ ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দেখা দিয়েছে রোগীর ভিড়।

রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে গিয়ে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এক মাস আগেও যেখানে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে ২৫০ রোগী আসতেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, অধিকাংশ শিশু জ্বর, শরীরে র‌্যাশ ও ডায়রিয়া নিয়ে আসছে। অনেকের ডেঙ্গু পরীক্ষায় শনাক্ত না হলেও উপসর্গ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। প্রতিদিন হাসপাতালে আসা রোগীদের একটি অংশকে ভর্তি করতে হচ্ছে।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা শিক্ষিকা সুলতানা বেগম তার দুই বছরের সন্তান আরাফকে নিয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, এক সপ্তাহ ধরে তার সন্তানের রাতে জ্বর আসছে। ডেঙ্গু বা হাম হতে পারে—এমন আশঙ্কায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হাসপাতালে এসেছেন তিনি।

হাসপাতালে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের অনেকেই জানান, তাদের পরিবারের একাধিক সদস্য জ্বরে আক্রান্ত। ঘরোয়া চিকিৎসায় জ্বর না কমায় তারা হাসপাতালে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

পুরান ঢাকার আরেক বাসিন্দা হিমেল চৌধুরী বলেন, তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনজন জ্বরে আক্রান্ত। তিনি যে ছয়তলা ভবনে থাকেন, সেখানকার প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাটেই একাধিক ব্যক্তি জ্বরে ভুগছেন। ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর না কমায় উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

একই উপসর্গ, ভিন্ন রোগ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ডেঙ্গু, হাম, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণ একই সময়ে চলায় রোগ নির্ণয় জটিল হয়ে উঠেছে। একই ধরনের জ্বর হলেও প্রতিটি রোগের উপসর্গ ও চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন।

ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে শরীর ও চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ এবং গুরুতর অবস্থায় রক্তক্ষরণ ও শকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। হামের ক্ষেত্রে জ্বরের পর শরীরে র‌্যাশ ছড়িয়ে পড়ে এবং গুরুতর জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ থাকার প্রবণতা বেশি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা বর্তমানে জ্বরের অন্যতম প্রধান কারণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ও টাইপ-বি—দুটিই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শনাক্ত হচ্ছে। ঘনবসতির কারণে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এসব ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, “জ্বরের এখন ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনও রয়েছে। পাশাপাশি হাম ও চিকুনগুনিয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও শরীর ব্যথা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকছে।”

তিনি আরও বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের তীব্র শরীর ব্যথা হতে পারে, যার কারণে হাঁটা-চলায় সমস্যা দেখা দেয়। জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া কিংবা ইন্টারনেট দেখে চিকিৎসা শুরু করা বিপজ্জনক। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে এলে চিকিৎসার সুযোগও সংকুচিত হয়ে যায়। তাই জ্বর হলে দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ডেঙ্গুর দুই সেরোটাইপ নিয়ে উদ্বেগ

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ—ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। এবারের সংক্রমণে ডেন-২ ও ডেন-৩-এর উপস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের এক জরিপে শহরাঞ্চলে ডেন-৩ এবং গ্রামীণ এলাকায় ডেন-২ সেরোটাইপের প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে বলে উঠে এসেছে। ফলে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ শনাক্তকরণ এবং রোগীর যথাযথ চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপও রয়েছে। ফলে সাধারণ জ্বর ভেবে রোগটি অবহেলা করলে বিপদ বাড়তে পারে। যেকোনো ধরনের জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি। সময়মতো ডেঙ্গু শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে গুরুতর জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৭১

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মঙ্গলবারের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন।

নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৯৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩৪ জন এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৪০৮ জন রয়েছেন।

এ ছাড়া বরিশালে ১৪২ জন, চট্টগ্রামে ১৭৭, খুলনায় ২৪২, ময়মনসিংহে ৭৭, রাজশাহীতে ১১৬, রংপুরে ৭১ এবং সিলেটে আটজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুইজন, ফেব্রুয়ারিতে দুইজন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনে মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের।

তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান

ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে সারাদেশে বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসব্যাপী এ কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা কার্যক্রম সমন্বয় করবেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এ কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।

পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হবে। প্রতি শনিবার স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন। একই সঙ্গে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস এবং মানুষকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।” স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আগামী তিন মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আশপাশের এলাকা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে টেলিভিশনে জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা তুলে ধরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণ থাকায় জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়াই হতে পারে গুরুতর জটিলতা এড়ানোর অন্যতম উপায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন