মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য, হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযান

ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একাধিক ফ্রন্টে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হুতিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে রাজধানী সানা পুনর্দখল করা।

সোমবার দেশটির তায়েজ, আল-বাইদা ও আল-জাওফ প্রদেশে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে আল-জাওফকে রাজধানী সানার দিকে অগ্রসর হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, হুতিদের বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থলবাহিনীও তীব্র লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে।

অন্যদিকে হুতিদের দাবি, আল-জাওফে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা তারা প্রতিহত করেছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে কোন পক্ষ কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কারাগারে হামলায় ৭ জন নিহতের দাবি হুতিদের

সংঘাতের মধ্যেই আল-জাওফের আল-হাজম শহরের একটি কারাগারে বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে হুতি কর্তৃপক্ষ।

হুতিরা এ হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেছে এবং এর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগে হুতিদের হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দুই পক্ষের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে লড়াই

সাম্প্রতিক সংঘর্ষ প্রথমদিকে তায়েজের পশ্চিমাঞ্চল ও হোদেইদার দক্ষিণের কয়েকটি এলাকায় বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। পরে তা আল-দালিয়া, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বাইদাসহ আরও কয়েকটি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

একাধিক এলাকায় একসঙ্গে অভিযান চালিয়ে হুতি বাহিনীর ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে সরকারপন্থী বাহিনী। এর ফলে হুতিদের বিভিন্ন ফ্রন্টে নিজেদের যোদ্ধা ও সামরিক সরঞ্জাম ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ইয়েমেনের সংঘাত নতুন ও আরও জটিল পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ আল-জাওফ ও আল-বাইদা

চলমান সংঘাতে আল-জাওফ প্রদেশের নিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রদেশটির সঙ্গে সৌদি আরবের সীমান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে এটি হুতিদের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সাদা প্রদেশের দিকেও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।

রাজধানী সানার দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রেও আল-জাওফের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে আল-বাইদা ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বও ব্যাপক। প্রদেশটি উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের একাধিক গভর্নরেটের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে আল-বাইদার নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীর চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বাব আল-মান্দেব ঘিরেও উত্তেজনা

স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা বেড়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

সৌদি জাহাজের জন্য এ নৌপথ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল হুতিরা। এর ফলে সংঘাত শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের তেল পরিবহনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সানা পুনর্দখল কতটা সম্ভব

ইয়েমেনের রাজধানী সানা দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে শহরটি পুনর্দখলের ঘোষণা সরকারপন্থী বাহিনীর জন্য বড় ধরনের সামরিক লক্ষ্য।

তবে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে হলে সরকারি বাহিনীকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল অতিক্রম করতে হবে। আল-জাওফসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধের ফলাফল তাই পরবর্তী সামরিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারপন্থী বাহিনী প্রাথমিক চাপ সামলে এখন যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে একাধিক ফ্রন্টে হুতিদের ব্যস্ত রেখে তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

অন্যদিকে হুতিরাও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পাল্টা প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন উত্তেজনা

দীর্ঘদিনের সংঘাতে ইয়েমেন ইতোমধ্যে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। নতুন করে বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ এবং বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে সৌদি সীমান্তবর্তী আল-জাওফ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।

সরকারি বাহিনী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য সামনে এনে পাল্টা অভিযান জোরদার করলেও যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি এখনো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। দুই পক্ষই সামরিক সাফল্যের দাবি করছে। ফলে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনের আল-জাওফ, আল-বাইদা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টের লড়াইয়ের ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন