সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কয়েক দিনের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে: তিতুমীর

দেশে চলমান গ্যাস সরবরাহ সংকট কাটিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি পর্যায়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে দ্রুতই সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘এনার্জি সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ: ফ্রম ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টু এ রেজিলিয়েন্ট এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক এ সেমিনারে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, গ্যাস সরবরাহ, আমদানিনির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

জ্বালানি খাত ভঙ্গুর অবস্থায় পেয়েছে সরকার

ড. তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আর্থিক ও কৌশলগত—উভয় দিক থেকেই কঠিন অবস্থার মধ্যে ছিল। এ খাতের জন্য সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনারও ঘাটতি ছিল।

পূর্ববর্তী সময়ের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে জ্বালানি খাত প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতার মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

এর প্রভাব সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্প ও বিনিয়োগ খাত পর্যন্ত পড়ছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।

নতুন এলএনজি অবকাঠামো ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর

গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, একাধিক উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

এর মধ্যে রয়েছে নতুন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যমান গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কূপ খনন।

ড. তিতুমীরের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করলে হবে না। দেশীয় উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বালানির উৎসেও বৈচিত্র্য আনতে হবে।

তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ ‘এনার্জি মিক্স’ বা জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে উৎপাদনে যাবে না রূপপুর

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন নিয়েও সেমিনারে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পারমাণবিক নিরাপত্তার সব শর্ত শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পরই কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়া হবে। নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণ কার্যক্ষম হয়ে উঠতে পারে বলে জানান তিনি।

সরাসরি আমদানিতে এলপিজির দাম কমার প্রত্যাশা

দেশের এলপিজি বাজার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, বড় আকারের ভিএলসি কার্গোর মাধ্যমে সরাসরি গ্যাস আমদানির সুযোগ তৈরি করা গেলে দেশে এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারি পর্যায়ে গ্যাস আমদানির নতুন উদ্যোগ কার্যকর হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এর সুফল সাধারণ ভোক্তারা পেতে পারেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গড়ে ওঠার অভিযোগও করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তাঁর মতে, নতুন আমদানি ব্যবস্থা কার্যকর হলে এলপিজির বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হবে।

স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার তাগিদ

জ্বালানি নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার চিন্তার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান ড. তিতুমীর।

তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর জ্বালানি আমদানির প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, কার্যকর জ্বালানি নিরাপত্তা বলতে এমন একটি ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে জনগণ ও অর্থনীতির জন্য জ্বালানি হবে সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য এবং পর্যায়ক্রমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে।

এ জন্য এমন অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন, যা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা বা আর্থিক চাপের মধ্যেও দেশের জ্বালানি সরবরাহকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বহিঃখাতের ভারসাম্যের ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও নজর রাখার কথা বলেন তিনি।

সেমিনারে বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, এসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মনজুর আলম প্রধানসহ জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন