রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাতারে হামলার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার নেতানিয়াহুর, গাজায় কাতারি অর্থ নিয়েও দিলেন ব্যাখ্যা

কাতারের রাজধানী দোহায় গত বছর হামলা চালানোর কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে দেশটিকে ‘বৈরী’ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে গাজায় কাতারের অর্থ পাঠানোর সুযোগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। তার দাবি, ওই অর্থ মানবিক সহায়তার জন্য পাঠানো হয়েছিল এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সুপারিশেই তা গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম i24NEWS-কে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন নেতানিয়াহু। সাক্ষাৎকারটি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শেয়ার করেন।

নেতানিয়াহু বলেন, কাতার ইসরায়েলের নীতি নির্ধারণ করেনি। বরং যুদ্ধের সময় ইসরায়েল কাতারে হামলা চালিয়েছে। তার এ বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দোহায় ইসরায়েলি হামলার এক বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

দোহায় কী ঘটেছিল

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থানরত হামাসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের একটি প্রতিনিধিদল, যারা তখন গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছিল।

ওই হামলায় ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে হামাসের পাঁচ সদস্য এবং কাতারের নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। তবে হামাসের যুদ্ধবিরতি আলোচনায় যুক্ত শীর্ষ নেতারা হামলা থেকে বেঁচে যান।

ঘটনার পর কাতার কঠোর ভাষায় ইসরায়েলের নিন্দা জানায়। দোহা হামলাটিকে কাতারের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে।

কাতার দীর্ঘদিন ধরে গাজা যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশটি। ফলে মধ্যস্থতাকারী একটি দেশের ভূখণ্ডে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় সে সময় ব্যাপক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিন্দা

দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ কাতারের প্রতি সংহতি জানায়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ওই হামলাকে কাতারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছিলেন।

কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও হামলার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হামলার লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রতিনিধিদল, যারা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছিল।

গাজায় কাতারের অর্থ নিয়ে বিতর্ক

সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু গাজায় কাতারের অর্থ প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তার সরকারের সমালোচনা রয়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, ইসরায়েলের অনুমোদনে কাতারের পাঠানো অর্থের একটি অংশ হামাসকে শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর বিষয়টি নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যায়।

তবে নেতানিয়াহু এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তার দাবি, কাতার থেকে গাজায় পাঠানো অর্থের উদ্দেশ্য ছিল মানবিক সহায়তা দেওয়া। ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সুপারিশের ভিত্তিতেই অর্থ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, কাতারের ওই অর্থ গাজায় প্রবেশ করা মোট অর্থের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ।

কী বলছে কাতার

হামাসকে অর্থায়নের অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে কাতার। দোহার দাবি, গাজার জনগণের মানবিক প্রয়োজন মেটাতেই তাদের অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট তদারকির মধ্যে পরিচালিত হয়েছে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি এর আগে বলেছেন, কাতার হামাসকে অর্থায়ন করেছে—এমন অভিযোগের ভিত্তি নেই। তার দাবি, কাতারের সহায়তা গাজার জনগণের জন্য দেওয়া হয়েছে এবং অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রও অবগত ছিল।

ফলে কাতারি অর্থ নিয়ে বিতর্কে দুই পক্ষের অবস্থান স্পষ্টতই ভিন্ন। নেতানিয়াহুর সমালোচকদের একটি অংশ অর্থ প্রবেশের অনুমোদনকে হামাসের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ও কাতার—দুই পক্ষই বলছে, ওই অর্থ ছিল গাজার মানুষের মানবিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য।

নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর মন্তব্য

কাতার নিয়ে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইসরায়েল জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং এর পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর এটিই হবে ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।

নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু একাধিক ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছেন। গাজা যুদ্ধ পরিচালনা, ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, অর্থনীতি এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত নির্বাচনী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

নেতানিয়াহুর ডানপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যেও বিভাজন রয়েছে। ছোট কয়েকটি ডানপন্থী দলের পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তার জোটের ভোট ভাগ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে কাতারকে ‘বৈরী’ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা এবং দোহায় হামলার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে সমর্থন করার বিষয়টি ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতেও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে তার বক্তব্য গাজা যুদ্ধ ঘিরে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা এবং ইসরায়েল-কাতার সম্পর্কের জটিলতাকেও আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে কাতার যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে, অন্যদিকে সেই দেশের ভূখণ্ডেই হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল।

দোহায় সেই হামলার এক বছর পূর্তির মাত্র কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহুর সর্বশেষ বক্তব্য তাই শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, কাতার গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস অফিস ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন