মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গণহত্যার প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করছে ইসরায়েল: হামাস

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ব্যাপকভাবে ধ্বংসস্তূপ অপসারণ ও গুঁড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার আলামত নষ্ট করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। সংগঠনটির দাবি, যেসব স্থানে এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, সেখানকার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজার হাজার নিখোঁজ ফিলিস্তিনির মরদেহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বস্তুগত ও ফরেনসিক আলামতও থাকতে পারে।

হামাস এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি সরকার ও সামরিক বাহিনী গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানো, গুঁড়িয়ে ফেলা এবং অন্যত্র পরিবহনের মাধ্যমে গত দুই বছরের সংঘাতে সংঘটিত অপরাধের সম্ভাব্য প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে।

সংগঠনটির ভাষ্য, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করার আগেই সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হলে গুরুত্বপূর্ণ আলামত স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর ফলে নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক তদন্তেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

হামাসের দাবি, মানুষের দেহাবশেষ ও সম্ভাব্য অপরাধের আলামত রয়েছে—এমন স্থান যথাযথ তদন্ত ছাড়াই পরিবর্তন বা ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সংগঠনটি এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) প্রমাণ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেছে।

একই সঙ্গে বিষয়টিকে নিহতদের মর্যাদা এবং তাদের পরিবারের অধিকারের সঙ্গেও যুক্ত করেছে হামাস। তাদের বক্তব্য, নিখোঁজ স্বজনের মরদেহ খুঁজে পাওয়া, শনাক্ত করা এবং ধর্মীয় ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী দাফনের সুযোগ পাওয়া পরিবারের অধিকার। ধ্বংসস্তূপ যথেচ্ছভাবে সরিয়ে ফেললে সেই অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ চায় হামাস

গাজার যেসব স্থানে মরদেহ ও সম্ভাব্য অপরাধের আলামত রয়েছে, সেগুলো সুরক্ষিত রাখতে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) হস্তক্ষেপ চেয়েছে হামাস।

সংগঠনটি গাজায় আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল পাঠানোরও আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার, পরিচয় শনাক্ত এবং সম্ভাব্য অপরাধের আলামত সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।

হামাস বলছে, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া গেলে একদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খল হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

পুনর্গঠনের জন্য ধ্বংসস্তূপ সরানো জরুরি, তবে আলামত রক্ষার দাবি

গাজার পুনর্গঠনের জন্য ধ্বংসস্তূপ অপসারণের প্রয়োজনীয়তার বিরোধিতা করছে না হামাস। সংগঠনটি স্বীকার করেছে, বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর বসবাসের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্গঠন শুরু করতে ধ্বংসস্তূপ সরানো জরুরি মানবিক প্রয়োজন।

তবে তাদের বক্তব্য, এ কাজ এমনভাবে করতে হবে যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা নিখোঁজ মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা যায় এবং সম্ভাব্য অপরাধের আলামত নষ্ট না হয়।

অর্থাৎ, পুনর্গঠন ও ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজের পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধার, পরিচয় শনাক্ত এবং ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।

১ কোটি টন ধ্বংসস্তূপ সরানোর দাবি মানবাধিকার সংস্থার

এদিকে জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের একটি প্রতিবেদনের তথ্যও সামনে এসেছে।

সংস্থাটি গত ৩ আগস্ট প্রকাশিত তথ্যে দাবি করে, গাজার ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপ ভাঙা ও অপসারণের কাজে যুক্ত রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব এলাকা গাজা উপত্যকার প্রায় ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

ইউরো-মেড মনিটরের হিসাবে, অন্তত এক কোটি টন ধ্বংসস্তূপ ইতোমধ্যে স্থানান্তর অথবা গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ ট্রাক ধ্বংসস্তূপ গাজা থেকে সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি ধ্বংস ও ধ্বংসস্তূপ গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজে প্রায় ৪০০টি ভারী যন্ত্র ব্যবহারের তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে।

তবে এসব পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান বড় চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ সময়ের সামরিক অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ আবাসিক এলাকা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। বহু ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হওয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হামাসের দাবি, এ পরিস্থিতিতে যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়াই ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ গুঁড়িয়ে ফেলা হলে নিখোঁজদের মরদেহের পাশাপাশি সম্ভাব্য অপরাধের ফরেনসিক আলামতও হারিয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই গাজার পুনর্গঠন শুরুর আগে বা এর সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে মরদেহ অনুসন্ধান ও প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন