রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম, প্রাথমিক শিক্ষায় আসছে বড় পরিবর্তন

শিশুবান্ধব শিখনপদ্ধতি, ডিজিটাল ক্লাসরুম ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ সরকারের

শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা ও শিখন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৮ সালের নতুন কারিকুলামে শিখনফলভিত্তিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা জানান। সাক্ষাৎকারে তিনি প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম ও শিখনপদ্ধতি

প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা ও শিখন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিমার্জিত ও উন্নত কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন কারিকুলামে বিদ্যালয়ভেদে শিখন ঘণ্টার বৈষম্য দূর করা এবং প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান ও শিখন উপকরণকে আরও বিজ্ঞানসম্মত, সহজবোধ্য, আকর্ষণীয় ও বয়সোপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন শ্রেণিকক্ষে খেলতে খেলতে পড়াশোনা করতে পারে, সে ধরনের আনন্দময় পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষণীয় খেলনা ও খেলাধুলার উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষকদের মাধ্যমে সহজভাবে পাঠদান সম্ভব হবে।

এ ছাড়া বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

২০২৭ সালের মধ্যে সব বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ধরে রাখা এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কর্মসূচিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কর্মসূচির আওতা বাড়াতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সব শিশুর জন্য দুপুরের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

খাবারের মান ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, মায়েদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মাদার্স কমিটি’র মাধ্যমে খাবার গ্রহণ ও বিতরণ কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে।

শিক্ষকদের হাতে ট্যাব, তৈরি হবে ডিজিটাল ইকোসিস্টেম

শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এটি কেবল ডিভাইস বিতরণের প্রকল্প নয়। গুগলসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যবস্থার মূল সংযোগ হিসেবে শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছে দেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এটি একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে কোনো শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যসূচি শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে কি না কিংবা শিক্ষার্থীরা কোন বিষয় বুঝতে পারছে না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া দুর্গম অঞ্চলের যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সৌর প্যানেল স্থাপন ও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার মানোন্নয়নে পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার

শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানান ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন শুধু বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ বা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে প্রকৃত অর্থে শিখছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি—এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

শিশুবান্ধব অবকাঠামো গড়ার পরিকল্পনা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবকাঠামো শুধু ভবননির্ভর হলে চলবে না। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন