মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষার্থী সংকটে ছোট ও মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ছোট ও অপেক্ষাকৃত কম মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষার্থী না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৭টি। এর মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে পরিচালিত হলেও প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী সংকটসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটির শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ ছাড়া অন্তত অর্ধশত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য কিংবা কোষাধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডেও পরিবর্তন এসেছে। তবে এসব পরিবর্তনের পরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

উচ্চশিক্ষায় আসন বেশি, শিক্ষার্থী কম

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে উচ্চশিক্ষায় মোট আসন প্রায় ১৩ লাখ। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজ এবং বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০ হাজার আসন রয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫ এবং পাস কোর্সে ৪ লাখ ২১ হাজার ৯৯০টি আসন রয়েছে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদরাসায় ৪৬ হাজার ৫২৯টি এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৭ হাজার ৫৯৩টি আসন রয়েছে। সরকারি অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানে আরও ১০ হাজারের বেশি আসন রয়েছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক পর্যায়ে এক সেমিস্টারে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯টি আসন রয়েছে। বছরে দুই সেমিস্টার হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় পৌনে চার লাখে দাঁড়ায়। তিন সেমিস্টার চালু থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হিসাব করলে আসন সংখ্যা আরও বাড়ে।

কিন্তু ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন শিক্ষার্থী। ফলে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে আসন পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব বিশেষ করে ছোট ও কম পরিচিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশি পড়ছে।

শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট

ইউজিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ও কমেছে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা এক বা দুজনের বেশি নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতনও তুলনামূলকভাবে কম।

কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সীমিত পরিসরের ভবন ভাড়া নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাবরেটরি, পাঠাগার কিংবা প্রয়োজনীয় একাডেমিক অবকাঠামো নেই বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার্থী না থাকায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যত নামসর্বস্বভাবে টিকে আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০১৬ সালের পর কমছে এইচএসসি পাসের হার

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী সংকটের অন্যতম কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়া।

২০১৬ সালের পর কয়েক বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। পরের বছর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ায় ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এরপর ২০২২ সালে পাসের হার কমে ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে তা আরও কমে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়েছে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলেও এখনো ফল প্রকাশ হয়নি।

স্থায়ী ক্যাম্পাসেও পিছিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫৩টি পুরোপুরি স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী সনদ পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে জমি কেনার পরও স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে না পারা কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে না পারার ঘটনাও রয়েছে।

কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষার্থী সংকট নেই

তবে দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, প্রায় ১০ থেকে ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। বরং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী নির্বাচন করে।

এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পরবর্তী পছন্দের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থী সংকটের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে।

মান দিয়েই টিকে থাকতে হবে: ইউজিসি চেয়ারম্যান

এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার মান নিশ্চিত করেই টিকে থাকতে হবে। শিক্ষার মান ভালো হলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে।

তিনি বলেন, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করার বিষয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় আকৃষ্ট করার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিদেশি শিক্ষার্থী আনার উদ্যোগ নিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বাস্তবতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য শুধু আসন ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার মান, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণা ও কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থী সংকটের কারণে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন