সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আসছে ‘ওয়ান এনবিআর’; আয়কর-ভ্যাট-কাস্টমসের তথ্য থাকবে সমন্বিত ব্যবস্থায়

দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্য অর্জনে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর পরিপালন জোরদার, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে একই সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এনবিআরের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামো। এর আওতায় আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ পৃথকভাবে তথ্য ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে করদাতা ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিরূপণ, কর পরিশোধ, বকেয়া রাজস্ব এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বিনিময়ে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির এই রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সরকারি ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রথম লক্ষ্য ৮.৮, এরপর ১০ শতাংশ

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর-জিডিপি অনুপাত স্বল্পমেয়াদে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হার ১৫ শতাংশে নেওয়া হবে।

এনবিআরের তথ্য বলছে, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশির ভাগ সময় ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা প্রায় ১০ শতাংশে উঠলেও পরে আবার কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এনবিআরের হিসাবে, সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে সংস্থাটির মাধ্যমে। তবে দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও নিচের দিকে রয়েছে।

সরকারি ব্যয়ের তুলনায় পিছিয়েছে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি

এনবিআরের ২৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে সরকারি ব্যয় ও রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধির মধ্যে ব্যবধানও উঠে এসেছে। পর্যালোচিত সময়ে সরকারি ব্যয় ৪ দশমিক ৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব আহরণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ গুণ।

২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে বলে মনে করছে এনবিআর।

সংস্থাটির মূল্যায়ন হচ্ছে, শুধু করের হার বাড়িয়ে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। করের আওতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও তথ্যের কার্যকর ব্যবহার, কর ফাঁকির ঝুঁকি শনাক্ত এবং করদাতাদের পরিপালন নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

প্রত্যেক করদাতার জন্য ‘মাস্টার ডেটাবেজ’

সংস্কার পরিকল্পনায় প্রতিটি করদাতার জন্য স্বতন্ত্র মাস্টার ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে অভিন্ন ডেটা ডিকশনারি, সিস্টেম ইনভেন্টরি এবং সমন্বিত এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রথম তিন বছরে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট এবং গ্রাহক ও মামলা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে করদাতার তথ্য মিলিয়ে দেখা, বিভিন্ন করের পরিপালন ঝুঁকি একই পদ্ধতিতে শনাক্ত করা এবং কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ ছাড়া রাজস্ব নীতি সচিবালয় গঠন, কর-ব্যয়ের রেজিস্টার তৈরি এবং নতুন রাজস্ব নীতির আর্থিক প্রভাব নিরূপণে বাধ্যতামূলক টেমপ্লেট চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

রিটার্ন থেকে রিফান্ড—বাড়বে অটোমেশন

পরিকল্পনার পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরের ধাপে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর। এর মধ্যে প্রায় তাৎক্ষণিক কর পরিপালন বিশ্লেষণ, আইনি সুযোগ সাপেক্ষে আগে থেকেই তথ্য পূরণ করা কর রিটার্নের পরিধি বাড়ানো এবং কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিফান্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য জালিয়াতি বা কর ফাঁকি শনাক্ত করতেও উন্নত ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

কাস্টমসের বিশেষায়িত সীমান্ত কার্যক্রম বহাল রেখেই আমদানি-রপ্তানিকারকের পরিচয়, পণ্যের মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট ভ্যাট ও আয়কর ঝুঁকির তথ্য একীভূত করার প্রস্তাব করেছে এনবিআর।

শিল্প ও রপ্তানিতেও রাজস্ব নীতির সহায়তা

রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পায়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও করনীতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতিতে শুল্ক সুবিধা, কৃষি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্যাট সুবিধা এবং নির্দিষ্ট খাতে আয়কর ছাড় বা কম হারের মতো ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কাস্টমস অটোমেশন ও সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ করার উদ্যোগ রয়েছে।

কৃষি, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন, মোবাইল ফোন, এসএমই, পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, ওষুধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন খাত রাজস্ব নীতির সহায়তার আওতায় রয়েছে।

এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রাজস্ব প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন