শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
তিনি বলেন, দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘Second China-Bangladesh Roundtable on Governance Experience Exchange’ শীর্ষক রাউন্ডটেবিল আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর চায়না স্টাডিজ (CCS), সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (SIIS), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, OCPASS এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (BIISS) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. লি কাইশেং এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর লি সাওপিং। গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী।
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। জ্ঞান সৃষ্টি ও বিনিময়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণেও বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আরও কার্যকর সহযোগিতায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি ও টেকসই সামুদ্রিক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র। মৎস্য, নৌপরিবহন, উপকূলীয় উন্নয়ন, সামুদ্রিক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমুদ্রভিত্তিক খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য, দক্ষ জনবল ও কার্যকর সুশাসন প্রয়োজন।
ঢাবি উপাচার্য বলেন, সামুদ্রিক গবেষণা, প্রকৌশল, মৎস্য ও জলজসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে উপকূলীয় অভিযোজন এবং ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও চীনের সঙ্গে বিনিময় করা যেতে পারে।
তিনি জানান, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ফার্স্ট ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (FIO)-এর মধ্যে সমুদ্রবিজ্ঞান, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, পূর্বাভাস, জলবায়ু গবেষণা ও দুর্যোগ সহনশীলতা বিষয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক নবায়ন করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় চীনের রয়েছে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। দুই দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে দুই দেশের গবেষক, নীতিনির্ধারক ও পেশাজীবীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে সমুদ্রবিজ্ঞান, জলবায়ু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীনের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকেও বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গেস্ট অব অনার এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে সরকার-টু-সরকার পর্যায়ের পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের পাশাপাশি সুষ্ঠু নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাউন্ডটেবিল আলোচনায় চীন ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা সুশাসন ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময়, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। এ সময় দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিভিন্ন সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে এশিয়ার অভিন্ন উন্নয়ন বিষয়ে ধারণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে ‘Keywords to Understand the Common Development in Asia’ গ্রন্থের প্রথম বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। ৮৫টি বিষয় নিয়ে চারটি অধ্যায়ে সাজানো বইটিতে এশিয়ার দেশগুলোর যৌথ উন্নয়ন ভাবনা ও উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের জন্য বইটির কয়েকটি কপি হস্তান্তর করা হয়।

